images

জাতীয়

প্রতিটি টিকিটে ১০০-৩০০ টাকা বেশি আদায়!

মোস্তফা ইমরুল কায়েস

১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:২৬ পিএম

  • টার্মিনালে ভিজিলেন্স টিম, র‌্যাব ও পুলিশ সদস্যরা বসেই সময় কাটাচ্ছেন
  • ভিজিলেন্স টিমের বুথে গত তিন দিনে অভিযোগ পড়েছে মাত্র ১০টি
  • মাঝপথে নামিয়ে দেওয়া ও ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ উত্তরের রুটগুলোতে

ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের কাছ থেকে দূরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে না—সরকারের এমন দাবির সত্যতা মিলছে না মাঠপর্যায়ে। টিকিটে সরকার নির্ধারিত ভাড়া লেখা থাকলেও বাস্তবে যাত্রীদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরকারি পরিবহন বিআরটিসির বাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

বুধবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাবতলী আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ঘুরে উত্তরের বিভিন্ন রুটের যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

যাত্রীদের অভিযোগ, রংপুর, বগুড়া, নাটোর, রাজশাহী, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও রুটে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। টার্মিনালের ভেতরের কাউন্টারগুলোতে তেমন ভিড় না থাকলেও কিছু কাউন্টারে নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট বিক্রি হতে দেখা গেছে।

দুপুর তিনটার দিকে টার্মিনালের পশ্চিম পাশে বিআরটিসি ডিপো থেকে মাইকে ঢাকা–রংপুর ভাড়া সাড়ে ৭০০ টাকা ঘোষণা করা হচ্ছিল। তবে ডিপোর সামনে কয়েকটি বাস থামিয়ে হেলপারদের ৮০০ টাকা ভাড়া হাঁকাতে দেখা যায়। ডিপোর এক কর্মী বলেন, ডিপো থেকে ৭৫০ টাকা নেওয়া হলেও টার্মিনালের কিছু কাউন্টারে ৮৭০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।

তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে মূল সড়কে আসতেই চোখে পড়ে, ঢাকা টু রংপুর এসআই ট্রাভেলস ১২০০ টাকা ভাড়া চাচ্ছে। হেলপার জানান, এই ভাড়া ছাড়া যাত্রী নেওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে আজিজ ও লতিফ ট্রাভেলসের দুটি বাসে ঢাকা টু রাজশাহীর ভাড়া হাঁকানো হচ্ছে ৭০০–৭৫০ টাকা। কিন্তু সাধারণত এ রুটের ভাড়া ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা।

আরও পড়ুন: ঈদে বাড়ি ফেরা হলো না, সদরঘাটে লঞ্চের চাপায় প্রাণ গেল যাত্রীর

তবে ঈদের দুই দিন আগে বাড়ি যেতে হবে বলে বাধ্য হয়ে যাত্রীরা বাড়তি ভাড়ায় টিকিট কাটছেন। কাউন্টারগুলোতে এখনো স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে। যদিও বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি কোনো কাউন্টার স্বীকার করছে না।

নাটোর যাবেন মুনীর দম্পতি। তারা জানান, নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় তাদের কাছ থেকে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তারাও জানেন। কিন্তু তারা মনে করেন, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ করলেও সমাধান মিলবে না। উল্টো তারা বিপদে পড়বেন। ফলে টার্মিনালের ভেতরে র‌্যাব, পুলিশ ও বিআরটিএর ভিজিলেন্স টিমের বুথ থাকলেও তারা সেখানে যাননি।

এসি বাসে ঢাকা টু রংপুর ১৫০০!

পলাশ, রুবেল, মাহফুজ ও মনি—চার বন্ধু ঢাকা থেকে বুধবার বিকেলে রংপুরে যাবেন। এজন্য তারা আহাদ পরিবহনের কাউন্টারে ঢুকেছিলেন। সেখানে তাদের কাছে এসি বাসের জন্য গাবতলী টু রংপুর ১৫০০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়। পরে তারা সেই কাউন্টার থেকে বেরিয়ে আসেন। সে সময় তাদের সঙ্গে কথা হয়।

তারা জানান, এর আগে তারা দুজন মিলে ঢাকা টু রংপুর এসি বাসে মাত্র দেড় হাজার টাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু আজ একজনের ভাড়াই দেড় হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে। বাসের কন্ডিশনও তেমন ভালো নয়। নামকাওয়াস্তে এসি।

পরে চার বন্ধু সেন্টমার্টিন বিএনএস ট্রাভেলস নামে একটি বাসের কাছে যান। তাদের পিছু ধরে এই প্রতিবেদক সেখানে গেলে দেখা যায়, দাঁড়িয়ে থাকা বাসটির গেটে ১২ থেকে ১৫ জনের জটলা। দুজন ব্যক্তি হাতে টিকিট নিয়ে সেই এসি বাসের টিকিট বিক্রি করছেন। এই প্রতিবেদক তাদের একজনকে রংপুরের ভাড়া কত জানতে চাইলে তিনি জানান, দেড় হাজার টাকা।

অন্যদিকে ঢাকা থেকে বগুড়ার জন্য ৮০০–৮৫০ টাকা ভাড়া নিচ্ছে শাহ ফতেহ আলী পরিবহন। যেখানে অন্য সময়ে নেওয়া হয় ৫০০–৫৫০ টাকা।

ভিজিলেন্স টিমের বসেই সময় কাটে!

বাস টার্মিনালটির ভেতরে বিআরটিএর ভিজিলেন্স টিমের একটি বুথ বসানো হয়েছে। কিন্তু এই টিম সারাদিন বুথেই বসে থাকে বলে অভিযোগ উঠেছে। সেখানে গিয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা হয়। তারা দাবি করেন, গত তিন দিনে মাত্র ১০টি অভিযোগ পড়েছে। আজ কোনো অভিযোগ নেই।

আরও পড়ুন: বাসের ‘স্ট্যান্ডবাই’ টিকিটে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া

তারা দাবি করেন, প্রতিটি কাউন্টার ঘুরে ঘুরে দেখা হচ্ছে। গত কয়েক দিনে যেসব অভিযোগ এসেছে, তার মধ্যে মাঝপথে নামিয়ে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ বেশি। সেখানে প্রতিদিন ৮–৯ জন দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও তাদের দুটি করে মোবাইল টিম টার্মিনালে কাজ করছে বলে জানান তারা। তাদের ভাষ্য, কাউন্টার ছেড়ে রাস্তায় টিকিট কাটার ফলে বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ফলে বিষয়টি ধরা কঠিন। তবে অভিযোগ পেলেই তারা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছেন।

সেখানে থাকা বিআরটিএর পরিচালক মমতাজ বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, বেশি ভাড়া আদায় করছে যারা কাউন্টারের বাইরে কাজ করছে। এ বিষয়ে আমাদের মোবাইল টিম কাজ করছে।

র‌্যাব ও পুলিশ গল্পগুজব করেই সময় কাটাচ্ছে!

গাবতলী বাস টার্মিনালে নিরাপত্তা ছাড়াও যাত্রীদের সুরক্ষার বিষয়গুলো দেখভালের জন্য র‌্যাব-৪ ও পুলিশের অস্থায়ী কন্ট্রোল রুম তৈরি করা হয়েছে। বেশি ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ র‌্যাব পাচ্ছে কি না জানতে চাইলে র‌্যাব-৪–এর পক্ষ থেকে সেখানে দায়িত্ব পালনকারী জাকির ও আজিজুল হক নামের দুই র‌্যাব সদস্য জানান, তারা এমন কোনো অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেবেন।

এমআইকে/এআর