নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ মার্চ ২০২৬, ১০:২২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে বিশ্বজুড়েই জ্বালানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর আঁচ লেগেছে বাংলাদেশেও। দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসেরও কম সময়ে সরকার জ্বালানি সংকটের শঙ্কায় দুশ্চিন্তায় পড়েছে। এই অবস্থায় নানা বিকল্প উপায়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের ফেলে জ্বালানি সংকটের মধ্যেও কয়েকটি স্বস্তির খবর সামনে এসেছে।
জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবেলায় সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করে। পরিবহনের জন্য জ্বালানি সংগ্রহে পরিমাণ বেঁধে দেয়। তবে জ্বালানি তেলের সংকটে ঈদযাত্রা ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা দেখা দেওয়ায় সরকার এই পদ্ধতি তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামীকাল রোববার (১৫ মার্চ) কার্যকর হতে পারে নতুন নির্দেশনা।
এছাড়া যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে তেল কিনতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চেয়েছিল বাংলাদেশ। সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ৩০ দিনের জন্য রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল সংগ্রহের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
সরকার সম্ভাব্য সংকট মোকাবেলায় ভারত থেকে তেল আমদানিসহ আরও বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এতে জ্বালানি তেল নিয়ে যে হাহাকার দেখা দিয়েছিল তা অনেকটা কমে এসেছে। সরকার আশা করছে, পরিস্থিতি শিগগির স্বাভাবিক হয়ে আসবে। যদিও যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে সারা বিশ্বের মতোই বাংলাদেশকেও মুখোমুখি হতে হবে নানা সংকটের।
সারাদেশে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেল বিক্রির ক্ষেত্রে বিদ্যমান রেশনিং ব্যবস্থা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আগামীকাল রোববার থেকে দেশের সব ফিলিং স্টেশনে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ ও বিক্রি চলবে।
শনিবার (১৪ মার্চ) জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্মসচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
যুগ্ম সচিব বলেন, আপাতত ঈদ উপলক্ষে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান রেশনিং প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়েছে। আগামীকাল সকালেই এ বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে।
তিনি জানান, পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে জ্বালানি সরবরাহ ও বিক্রি চলবে।
এর আগে সড়ক পরিবহন ও সেতু, নৌপরিবহন এবং রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছিলেন, ঈদযাত্রায় গণপরিবহন পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাবে। তাদের জন্য কোনো বাধা-ধরা নিয়ম থাকবে না। তবে মোটরসাইকেলসহ অন্যান্য যানবাহনের জন্য রেশনিং পদ্ধতির আগের মতোই থাকবে বলে জানানো হয়েছিল। পরে অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, পুরো রেশনিং পদ্ধতিই আপাতত ঈদ উপলক্ষে তুলে দেওয়া হবে।
রাশিয়া থেকে জ্বালানি কেনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত থাকায় আপাতত এ নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
শনিবার (১৪ মার্চ) বিকেলে সিলেটে শ্রমজীবী পরিবারের সদস্যদের মাঝে ঈদ উপহার বিতরণ অনুষ্ঠান শেষে তিনি এ কথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ সময়ে কেউ রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনলেও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য স্থগিত থাকায় আপাতত এ নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হবে না।
মন্ত্রী বলেন, আসন্ন ঈদকে সামনে রেখে জ্বালানি সরবরাহে কোনো সংকট বা ঈদযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই। তিনি সবাইকে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সম্ভাব্য প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখন থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
এর আগে শুক্রবার মার্কিন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, জাহাজে লোড করা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বিক্রির জন্য অনুমতিপত্র দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। এর জবাবে দেশটির তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেছেন, বিশ্বব্যাপী জ্বালানির বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পদক্ষেপের অংশ হিসেবে রাশিয়ার তেলের ওপর অস্থায়ীভাবে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের হুমকি মোকাবিলা করতেও এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লার শ্রীকাইল-৫ কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে। নতুন এই কূপ থেকে প্রতিদিন প্রায় আট মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে বলে জানা গেছে।
শনিবার (১৪ মার্চ) আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাস উত্তোলন কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
২০২৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া কূপ খনন প্রকল্পে প্রায় ১৩২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, কূপটিতে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের মজুদ রয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমদানিনির্ভরতা দেশের জ্বালানি খাতকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। বৈশ্বিক সংকট দেখা দিলেই তার প্রভাব পড়ছে দেশের জ্বালানি খাতে। তাই সরকার নিজস্ব উৎস থেকে গ্যাস উত্তোলন বাড়িয়ে জ্বালানি খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেন, অতীতে বাপেক্সকে কার্যত দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, যার ফল এখন ভোগ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে চায় এবং প্রতিষ্ঠানটিকে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে চায়।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, আগামী পাঁচ বছরে দেশে গ্যাসের চাহিদা সাড়ে চার হাজার মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেই চাহিদা নিজেদের গ্যাসক্ষেত্র থেকেই পূরণ করার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগোচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সরকারের ১৮০ দিনের একটি বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জানা গেছে, শ্রীকাইল গ্যাসক্ষেত্রে ২০২০ সালের দিকে প্রতিদিন প্রায় ৩১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হলেও বর্তমানে পাঁচটি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এদিকে জাতীয় গ্রিড লাইনে ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকা ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের ইউনিট দুটি পুনরায় পুনরায় চালু হয়েছে। তবে গ্যাস সংকটের কারণে ইউনিটগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক (পরিচালন ও সংরক্ষণ) মোহা. আব্দুল মজিদ আজ শনিবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
তিনি বলেন, গত রাতে পর্যায়ক্রমে আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের নর্থ ও সাউথ ইউনিট পুনরায় চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে নর্থ ইউনিটটি রাত প্রায় ৮টার দিকে এবং সাউথ ইউনিটটি রাত ১২টার দিকে উৎপাদনে আসে।
আব্দুল মজিদ বলেন, ইউনিটগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর পুনরায় চালু করতে গিয়ে কিছু কারিগরি বিষয় সমাধানে সময় লাগে। বর্তমানে গ্যাসের স্বল্পতার কারণে ইউনিটগুলোকে আংশিক লোডে চালাতে হচ্ছে।
তিনি জানান, নর্থ ও সাউথ ইউনিট দুটি প্রায় ৩৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম। তবে গ্যাস সংকটের কারণে এর আগে কম লোডে চালানো হচ্ছিল। আশুগঞ্জের ইস্ট ইউনিটটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে এবং এতে একটি কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ত্রুটি সমাধানে আরও প্রায় দুই দিন সময় লাগতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নির্বাহী পরিচালক বলেন, প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে ইউনিটগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হবে এবং জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও বৃদ্ধি পাবে।
জেবি