বোরহান উদ্দিন
১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:৫৯ এএম
চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ঘটেছে নানা নাটকীয়তা। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দিনটি শুরু হয়েছিল স্বস্তির বার্তা দিয়ে। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের কোলাকুলি, কুশল বিনিময় আর সৌজন্যবোধ দেখা যায় সকাল থেকে। সরকারি দল ও বিরোধী দল পরস্পরকে সহযোগিতা করার কথাও বলেছে ভরা সংসদে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি কার্যকর সংসদ পাওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিলেন সংসদ সদস্যরা। কিন্তু চমৎকার সেই সূচনার শেষটা হয়েছে তুমুল হট্টগোল, রাষ্ট্রপতির ভাষণ বয়কট এবং বিরোধী দলের নাটকীয় ওয়াকআউটে।
একদিকে তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম সংসদে যাত্রা, অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ফ্যাসিবাদের দোসর আখ্যা দিয়ে বিরোধী দলের সংসদ কক্ষ ত্যাগ—সব মিলিয়ে প্রথম দিনেই উত্তপ্ত হয়ে উঠল সংসদীয় রাজনীতি।
তারেক রহমানের অন্যরকম অভিষেক
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হয় সংসদ। সাদা শার্ট, ব্লেজার ও নীল প্যান্টে সজ্জিত হয়ে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান যখন অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন, তখন পুরো হলরুম টেবিল চাপড়ানোর শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে।

১৯৯১ সালে তাঁর মা বেগম খালেদা জিয়া যে সংসদীয় ঐতিহ্যের সূচনা করেছিলেন, তারই দ্বিতীয় প্রজন্ম হিসেবে তারেক রহমান আজ সংসদ নেতার আসনে বসেন।
আরও পড়ুন: দেশ ও জনগণের স্বার্থই আমার রাজনীতি: সংসদে প্রধানমন্ত্রী
এ সময় ভিভিআইপি লাউঞ্জে উপস্থিত থেকে এই মুহূর্তের সাক্ষী হন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমান।
ঢাকা-১৭ আসন থেকে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই সরাসরি সংসদ নেতার দায়িত্ব নেওয়া তারেক রহমানের জন্য এটি ছিল এক অনন্য অভিষেক।
সৌজন্যতা, কোলাকুলি সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের
অধিবেশনের শুরুতে পরিবেশ ছিল অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ। স্পিকার হিসেবে হাফিজ উদ্দিন আহমেদ নির্বাচিত হওয়ার পর নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে বিএনপি থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান তাঁকে সাধুবাদ জানান।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতিকে তারা প্ল্যাকার্ড না দেখালেও পারতেন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
বিরতির সময় সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করতে দেখা যায়। সংসদ নেতার সহযোগিতা কামনার জবাবে বিরোধী শিবির থেকেও আশ্বাসের বাণী আসে। কিন্তু তা খুব বেশি সময় স্থায়ী হয়নি।
এর আগে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে সংসদ শুরু হওয়ার পর ৩০ মিনিটের বিরতিতেও এমন সৌজন্যতা দেখান সংসদ সদস্যরা।
আসনে বসতেই যান্ত্রিক বিড়ম্বনায় স্পিকার
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের স্পিকার পলাতক ও ডেপুটি স্পিকার জেলে থাকায় স্পিকার চেয়ারের ফাঁকা রেখেই সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। পরে ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়।
পরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পিকার নির্বাচিত হন হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং ডেপুটি স্পিকার হন ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।
বিএনপি নেতা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ উদ্দিন আহমেদকে রাষ্ট্রপতি শপথবাক্য পাঠ করানোর পর তিনি স্পিকারের চেয়ারে বসেন। তবে শুরুতেই তিনি মাইক বিড়ম্বনায় পড়েন। নিজের হাতে মাইক অন করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা কর্ডলেস মাইকের ব্যবস্থা করেন।
এই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সংসদ নেতা তারেক রহমানসহ অনেক সদস্যকে হেডফোন ব্যবহার করে বক্তব্য শোনার চেষ্টা করতে দেখা যায়। আজানের কারণে ২০ মিনিটের বিরতির পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
তবে কয়েক সারিতে বসা সংসদ সদস্যরা নিজের আসনে মাইক নষ্ট থাকায় কথা বলতে পারেননি বলে জানান। অন্যদিকে হেডফোনেও অনেকে শুনতে পাননি। কেউ আবার বিকট শব্দের কারণে সমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন।
শোক প্রস্তাবে জুলাই বিপ্লবের শহীদরা, যুক্ত করা হয় জামায়াত নেতারও নাম
অধিবেশনের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল শোক প্রস্তাব। প্রথা অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের পাশাপাশি এবার নজিরবিহীনভাবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের নাম শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফারহান ফাইয়াজসহ শত শত ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সংসদ। বিরোধী দলের দাবির মুখে মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামী এবং আবরার ফাহাদের নামও এই শোক প্রস্তাবে যুক্ত করা হয়। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা আবেগঘন বক্তব্য দেন।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলায় জামায়াতের যেসব নেতার ফাঁসি হয়েছে, তাঁদের নাম শোক প্রস্তাবে যোগ করা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।

অন্যদিকে প্রয়াত শরিফ ওসমান হাদীসহ অনেক সংসদ সদস্য ও আলোচিত ব্যক্তির নাম শোক প্রস্তাবে না থাকা নিয়েও সমালোচনা হয়েছে। যারা এই কাজে জড়িত ছিলেন, তাঁদের উদাসীনতার কারণে এমনটা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। পরে একে একে অনেকগুলো নামের তালিকা কাগজে লিখে স্পিকারের কাছে পাঠানো হয়।
আরও পড়ুন: রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের ৩ কারণ জানালেন জামায়াত আমির
এদিকে শোক প্রস্তাবের ওপর কথা বলতে দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে একাধিক নেতা তাঁর দৃঢ়তা ও দেশপ্রেমের কথা তুলে ধরেন।
আবার জুলাইযোদ্ধা ও শহীদদের স্মরণ করে তাঁদের স্বপ্নপূরণে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন অনেকে।
গ্যালারিতে উপচে পড়া ভিড়, ছিলেন আবু সাঈদের বাবা
ত্রয়োদশ সংসদের এই প্রথম অধিবেশন ঘিরে গ্যালারিগুলোতে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানসহ তিন বাহিনীর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতরা অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করেন।
তবে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি কেড়েছেন জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতীকী অতিথি, গুলিবিদ্ধ শহীদ গোলাম নাফিজকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া সেই সাহসী রিকশাচালক নুর মুহাম্মদ। শহীদ আবু সাঈদের বাবাও ছিলেন গ্যালারিতে।
সংসদের কোন সারিতে বসলেন কোন নেতা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে সরকারি দল বিএনপির প্রথম সারির প্রথম আসনে বসেছেন সংসদ নেতা তারেক রহমান, যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। সংসদ নেতার পাশের আসনে বসেছেন দলের মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এরপরের আসনে বসেছেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
পরের আসনগুলোতে পর্যায়ক্রমে বসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন।
প্রথম সারির মাঝামাঝি আসনে বসেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, বন ও পরিবেশ মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জ্বল হোসেন, ভূমি মন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আলতাফ হোসেন চৌধুরী, বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন।
সংসদ নেতার ঠিক পেছনে দ্বিতীয় সারিতে বসেছেন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তাঁর পাশে বসেছেন আইন মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
এরপর পর্যায়ক্রমে বসেছেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য জয়নুল আবেদিন ফারুক, ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান, আবদুস সালাম পিন্টু, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মজিবুর রহমান সারোয়ার, আমান উল্লাহ আমান, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, শাহজাহান চৌধুরী, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ সাকি, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, একেএম ফজলুল হক মিলন, গণঅধিকার পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল হক নূর, শিক্ষা মন্ত্রী এএনএম এহছানুল হক মিলন, হুইপ আশরাফ উদ্দিন নিজান, বাণিজ্য মন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বিমান মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী, লুৎফুজ্জামান বাবর এবং হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার।
বিকেল গড়াতে কিলার চুপ্পু স্লোগান, উত্তপ্ত ওয়াকআউট
দিনভর মোটামুটি স্বস্তিতে কাটলেও বিকেল গড়ালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যখন ভাষণ দিতে আসেন, তখনই সংসদের দৃশ্যপট বদলে যায়। স্পিকার রাষ্ট্রপতিকে আমন্ত্রণ জানালে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা নাহিদ ইসলাম এবং হাসনাত আবদুল্লাহ দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠেন—কিলার ইন দ্য পার্লামেন্ট। তারা রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেন।

মুহূর্তের মধ্যে বিরোধী দলের সদস্যরা প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান। এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ কিলার চুপ্পু, বয়কট চুপ্পু বলে স্লোগান দিতে থাকেন। রাষ্ট্রপতির সামনেই সংসদ সদস্যরা গেট আউট স্লোগান দিতে থাকেন।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান সরাসরি রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে বলেন, আপনি রাষ্ট্রের অভিভাবক হতে পারেননি। আপনি ফ্যাসিবাদের দোসরের ভূমিকা পালন করেছেন।
একপর্যায়ে ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্র একসঙ্গে চলে না স্লোগান দিয়ে বিরোধী উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরের নেতৃত্বে সংসদ কক্ষ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী সদস্যরা। রাষ্ট্রপতিকে প্রায় পাঁচ মিনিট নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকতে হয় এই নজিরবিহীন প্রতিবাদের মুখে।
বিইউ/এআর