images

জাতীয়

এডিপি বাস্তবায়ন হবে নতুন সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ

আব্দুল হাকিম

০৭ মার্চ ২০২৬, ১০:৪৬ এএম

  • জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত গড় বাস্তবায়ন ২১ শতাংশে
  • স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতি মাত্র প্রায় ৬ শতাংশ
  • বরাদ্দের মাত্র ২১.১৮ শতাংশ ব্যয় হয়েছে
  • মোট এডিপি বরাদ্দ ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা
  • পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়ন নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে বাস্তবায়নের হার নেমে এসেছে এক যুগের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত গড় বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২১ শতাংশের কিছু বেশি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য খাতের অগ্রগতি আশঙ্কাজনকভাবে কম, প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরে এডিপির মোট বরাদ্দ ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে সাত মাসে ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার ৫৫৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের মাত্র ২১.১৮ শতাংশ। অর্থবছরের অর্ধেকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাস্তবায়নের এই ধীরগতি প্রশাসনিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

স্বাস্থ্য খাতের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এই খাতে বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের হার মাত্র ৬.৫৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবকাঠামো নির্মাণ ও সেবার সম্প্রসারণে এ ধরনের বিলম্ব সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।

৩৮ বছর বয়সী মিজানুর রহমান পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নিজের গাড়িতে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে গুরুতর দগ্ধ হন তিনি। এরপর তাকে রাজধানীর জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয় এবং এখনো সেখানেই চিকিৎসা চলছে।

পাশে বসে থাকা তার স্ত্রী ফাতেমা বেগম জানান, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন। যদি নিজ জেলা চাঁদপুরে পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিট চালু থাকত, তাহলে ঢাকায় আসতে হতো না। বাড়ির কাছেই চিকিৎসা পাওয়া গেলে পরিবারের কষ্ট অনেক কমত। দুর্ঘটনার পর থেকে তারা ঢাকাতেই অবস্থান করছেন, যা অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপ বাড়িয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দেশের পাঁচটি বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। কিছু প্রকল্প শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়নি। ফলে জটিল রোগীদের চিকিৎসার জন্য এখনো রাজধানীর ওপর নির্ভরতা রয়ে গেছে।

5

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হলে তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। তিন বছরের প্রকল্প যদি আট বা দশ বছর ধরে চলে, তাহলে তার কার্যকারিতা ও পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতে অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সেবার ঘাটতিও তৈরি হয়। সরকার প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের অর্থ উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দ করে। সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা খাতে এই অর্থ ব্যয় হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবায়নের গতি কম থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির সময় ব্যয় কম দেখানো হয়। পরে সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ানো হয়। এতে শুরু থেকেই বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা থাকে না। সরকারি ক্রয় ব্যবস্থায় সর্বনিম্ন দরদাতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে অনেক সময় কম দর দিয়ে কাজ নেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবায়নে বিলম্ব ঘটে। পরবর্তীতে সংশোধনের সুযোগ থাকায় সময়ক্ষেপণের প্রবণতা তৈরি হয়। ফলে একটি প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ না হয়ে দীর্ঘায়িত হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমস্যা শুধু অর্থায়নের নয়, বরং পুরো বাস্তবায়ন কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে। তদারকি দুর্বলতা, সমন্বয়ের অভাব এবং জবাবদিহির ঘাটতি প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি সরাসরি জনজীবনে প্রভাব ফেলছে। নতুন হাসপাতাল, বিশেষায়িত ইউনিট ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সময়মতো চালু না হলে রোগীদের ভিড় বাড়ে রাজধানীর বড় হাসপাতালগুলোতে। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সেবার ঘাটতির কারণে অনেক রোগী জটিল চিকিৎসার জন্য ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে।

চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণ কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে না পারলে প্রকল্পের পূর্ণ সুফল পাওয়া যায় না।

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
 
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প পুনর্বিন্যাস করা হবে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষির মতো খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। তবে বাস্তবে অর্থবছরের অর্ধেক পেরিয়ে গেলেও এডিপি বাস্তবায়নের হার প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্বাচনি প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের সময় কিছুটা স্থবিরতা ছিল। টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বিল পরিশোধে বিলম্ব হয়েছে।

নতুন সরকারের জন্য তাই এডিপি বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতের প্রকল্পগুলো দ্রুত সম্পন্ন না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অব্যাহত থাকবে। আনিসুর রহমানের মতো অসংখ্য রোগী তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর ওপর নির্ভরশীল থাকবেন। সরকার পরিবর্তন হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি যেন স্থায়ী সমস্যা হয়ে না দাঁড়ায়, সে জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সময়মতো ও মান বজায় রেখে প্রকল্প শেষ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থবছরের শেষ দিকে দ্রুত ব্যয় বাড়ালে গুণগত মানের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন তদারকি করা প্রয়োজন। মাসভিত্তিক লক্ষ্য নির্ধারণ এবং নিয়মিত অগ্রগতি মূল্যায়ন করলে পরিস্থিতি উন্নত হতে পারে। প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্যতা যাচাই আরও শক্তিশালী করা দরকার। দরপত্র প্রক্রিয়ায় শুধু কম দর নয়, কাজের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। প্রকল্প বাস্তবায়নে কঠোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে সময়ক্ষেপণ কমবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, সরকারি ব্যবস্থায় কাজের ক্ষেত্রে খরচ ও মানের ভারসাম্যকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু অনেক সময় যেসব প্রতিষ্ঠান কম ব্যয় দেখায়, তারাই দরপত্রে এগিয়ে থাকে। ফলে কেউ কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে কম খরচ দেখিয়ে প্রকল্প গ্রহণ করে। পরবর্তীতে কাজের মেয়াদ বাড়ানো বা ব্যয় সংশোধনের সুযোগ থাকায় সেই ঘাটতি পূরণ করা যায়।

তিনি আরও বলেন, মূল প্রশ্ন হলো কেন একটি তিন বছরের প্রকল্প বাস্তবায়নে দশ বছর লেগে যায়। আমাদের বিদ্যমান বাস্তবায়ন কাঠামো বা সামগ্রিক ব্যবস্থাগত পরিবেশে কিছু দুর্বলতা রয়ে গেছে। এসব সমস্যা সমাধান না হলে প্রকল্প সময়মতো শেষ করা কঠিন হবে।

এএইচ/এএস