নিজস্ব প্রতিবেদক
০৫ মার্চ ২০২৬, ০১:২৪ পিএম
ধর্ষণের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ধর্ষণ আইনের সংস্কারসহ ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে ‘সাম্প্রতিক সময়ে ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগীর সুরক্ষা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
ধর্ষণ আইন সংস্কার জোটের লিগ্যাল স্পেশালিস্ট অ্যাডভোকেট আয়েশা আক্তার বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্ষণ ও সহিংসতার একাধিক নৃশংস ঘটনা ঘটেছে, যা সমাজের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় হুমকি দিয়ে এক নারীকে বাসায় ডেকে এনে ধর্ষণের অভিযোগ, পাবনার ঈশ্বরদীতে ৬৫ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর পাশের সরষে ক্ষেত থেকে তার ১৫ বছর বয়সী নাতনির লাশ উদ্ধার এবং চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বোটানিক্যাল গার্ডেন ও ইকোপার্ক এলাকায় সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা উল্লেখ করে তারা বলেন, এসব ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি বলেন, এসব সহিংসতা দেশের সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সমতা, বৈষম্যহীনতা, আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নারী ও শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতা এসব সাংবিধানিক অধিকারকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। এছাড়া নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গেও এ পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক বলে উল্লেখ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ধর্ষণ প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা দূর করা জরুরি। ২০১৮ সাল থেকে ধর্ষণ আইন সংস্কারের দাবিতে কাজ করছে এই জোট। এ লক্ষ্যে ধর্ষণ আইন সংশোধনের জন্য আট দফা দাবি তুলে ধরেন।
দাবিগুলো হলো
১. সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনাগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা।
২. ভুক্তভোগী, তাদের পরিবার ও সাক্ষীদের সুরক্ষা এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।
৩. ধর্ষণসহ যৌন সহিংসতার ঘটনায় সরকারি সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৪. মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধর্ষণ বিষয়ক আইন সংস্কার করা এবং ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করা।
৫. প্রতিবন্ধী ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করা।
৬. ধর্ষণ মামলায় ভুক্তভোগীর চরিত্রগত সাক্ষ্য ব্যবহারের বিরুদ্ধে আইন যথাযথভাবে প্রয়োগ করা।
৭. স্বাস্থ্যসেবা, বিচার বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা।
৮. প্রয়োজনীয় সংশোধনী যুক্ত করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ দ্রুত আইনে রূপান্তর করা।
ব্লাস্টের পরিচালক (পরামর্শ ও যোগাযোগ) মাহবুবা আক্তার বলেন, ‘ধর্ষণ প্রতিরোধে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, এর কার্যকর বাস্তবায়নও জরুরি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচার বিভাগ, প্রসিকিউটর, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং তাদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে।’
বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির ভাইস প্রেসিডেন্ট জাকিয়া আনোয়ার কলি বলেন, ‘ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলায় ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবচেয়ে জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ভয়, সামাজিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে বিচার চাইতে পারেন না। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে একটি শক্তিশালী সুরক্ষা তহবিল গঠন করা প্রয়োজন।’
বক্তারা বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমানে এসব ট্রাইব্যুনালে বিপুলসংখ্যক মামলা দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। এতে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে এবং অপরাধীরা শাস্তির ভয় হারিয়ে ফেলছে।
তারা বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে প্রায় দশ লাখ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে এক লাখের বেশি মামলা ধর্ষণ সংক্রান্ত এবং বহু মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এতে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বক্তারা আরও বলেন, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাও জরুরি। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধে রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যমকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির পক্ষ থেকে নবনির্বাচিত সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, সংবিধানের আলোকে আইনের শাসন নিশ্চিত করে নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এএইচ/এমআই