মোস্তাফিজুর রহমান
০৪ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
* দুই ধরনের ওষুধের বার্ষিক চাহিদা সাড়ে ১২ লাখ লিটারের বেশি
* এডালটিসাইড ওষুধের বর্তমান মজুদ ২ লাখ লিটারের বেশি, চলবে আরও দেড় মাস
* লার্ভিসাইডের মজুদ আছে সাড়ে ৬ হাজার লিটারের বেশি, চলবে ৬ মাস
রাজধানীতে মশার উৎপাত ঠেকাতে চীন ও ভারতের ওষুধের ওপর আস্থা রাখছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপারেশন (ডিএসসিসি)। দেশ দুটির তিনটি ওষুধ পরীক্ষা করে ‘শতভাগ’ কার্যকরের ফলাফলও হাতে পেয়েছে সংস্থাটি। এর মধ্যে চীনের একটি ও ভারতের একটি ওষুধের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। এগুলো পরীক্ষার আগে থেকেই ব্যবহার করে আসছে ডিএসসিসি। তবে পরীক্ষার ফলাফল গতকাল মঙ্গলবার পায় সংস্থাটি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপারেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিন্তে রহমান বুধবার (৪ মার্চ) ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘যে ওষুধগুলো ব্যবহার করছি, সেগুলো পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলাম। পরীক্ষা শেষে মঙ্গলবার (৩ মার্চ) শতভাগ সঠিক (কার্যকর) থাকার ফলাফল হাতে পেয়েছি। যেহেতু ওষুধে কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। তাই এগুলোই ব্যবহার অভ্যাহত রাখা হচ্ছে।’
মশা নিধনে দুভাবে ওষুধ নেওয়া হয়। একটি মশার লার্ভা ও পিউপা ধ্বংস করার জন্য। অন্যটি পূর্ণাঙ্গ বা উড়ন্ত মশা মারার জন্য। মশার লার্ভা ধ্বংসের কীটনাশককে ‘লার্ভিসাইড’ বলা হয়। এই তরল ওষুধ ছিটানো হয়। আর প্রাপ্ত বয়স্ক মশা বা উড়ন্ত মশার কীটনাশককে ‘এডালটিসাইড’ বলা হয়, এটি বিকেলে ফগিং করে দেওয়া হয়।
ডিএসসিসির ভান্ডার ও ক্রয় বিভাগ থেকে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিদিন এডালটিসাইড কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে ৪ হাজার ৫৭০ লিটার। এ হিসেবে এডালটিসাইড কীটনাশকের বার্ষিক চাহিদা ১২ লাখ ৪৩ হাজার ৪০ লিটার। আর লার্ভিসাইড কীটনাশক ব্যবহার হয় প্রতিদিন ৩৪ দশমিক ৭৫ লিটার। সে অনুযায়ী ৯ হাজার ৪৫০ লিটার লার্ভিসাইড কীটনাশকের চাহিদা। অর্থাৎ, দুটি মশার ওষুধ মিলে বার্ষিক চাহিদা সাড়ে ১২ লাখ লিটারের বেশি ওষুধ।
কোন ওষুধ, কত মজুদ?
ডিএসসিসির তথ্য বলছে, চীন ও ভারতের একটি করে দুটি এডালটিসাইড ওষুধ ছয় মাস করে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম অর্ধে চীনের ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে। এটি আগামী দেড় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে- এমন মজুদ রয়েছে। তবে ‘ডেল্টামেথ্রিন (Deltamethrin)’ নামে ভারতের তৈরি এডালটিসাইড ওষুধটির বর্তমানে মজুদ নেই।
ভাণ্ডার ও ক্রয় বিভাগ সূত্র বলছে, চীন থেকে সংগ্রহ করা মশার এডালটিসাইড কীটনাশকটির নাম ‘ম্যালাথিয়ন (malathion)'। এটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ফরওয়ার্ড ইন্টারন্যাশনাল (বিডি) লিমিটেডের মাধ্যমে সংগ্রহ করা।
দফতরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ ফেব্রুয়ারিতে ম্যালাথিয়ন কীটনাশকের মজুদ ছিল ২ লাখ ৩৭ হাজার ৬৪০ লিটার। যেহেতু দৈনিক চাহিদা চার হাজার ৫৭০ লিটার, সেহেতু ৫২ দিন ফগিং করার মতো ওষুধ ছিল। ফলে এখনো আরও দেড় মাসের ওষুধ মজুদ রয়েছে।
অন্যদিকে, বছরব্যাপী লার্ভিসাইড ওষুধ ব্যবহার হচ্ছে ভারতের কীটনাশক- টেমেফোজ ৫০ শতাংশ ইসি (temephose 50% EC)। এমআর এন্টারপ্রাইজ নামের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই ওষুধ সংগ্রহ করা হয়েছে। বতর্মানে এটির মজুদ আছে ৬ হাজার ৮৫০ লিটার, যা দিয়ে ১৯৮ দিন বা ছয় মাসের বেশি ব্যবহার করা যাবে।
জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান ভান্ডার ও ক্রয় কর্মকর্তা (উপসচিব) মো. জয়নুল আবেদীন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মশার কীটনাশকের কোনো সমস্যা নেই। মজুদও যতেষ্ঠ আছে। ঘাটতির পূর্বেই আমরা নতুন করে কীটনাশক সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলমান।’মজুদ না থাকা ডেল্টামেথ্রিন কীটনাশকের বিষয়ে তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই এটি সংগ্রহে ঠিকাদার ‘নির্বাচন করা হয়েছে’।

এবার কি কাজ হবে ওষুধে?
সারা বছরই মশার কীটনাশক ছিটানো ও ফগিং করা হয়। অথচ, ঢাকায় মশার উৎপাত কমে না। এতে মশার ওষুধের কার্যকারিতা সবসময়ই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। ফলে এবারও কতটা কাজ করবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।
এমন অভিযোগ ডিএসসিসি প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌসও পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা দুই জায়গা থেকে পরীক্ষা করেছি। দুটোর রিজাল্টই শতভাগ সঠিক এসেছে। এখন কী ব্যবহার না করে থাকবো?’
‘আগে কাজ হয় পরে কাজ হয় না। হয়েছে কি মশাও নিজের অভিযোজন ক্ষমতা চেঞ্জ করছে। এ কারণে পরে ওষুধে কাজ হয় না’, মনে করেন এই কর্মকর্তা।
ডিএসসিসি জানায়, সংগ্রহ করা কীটনাশকগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের পরীক্ষা উদ্ভিদ সংরক্ষণ উইং (পিপিডব্লিউ) এবং স্বাস্থ্য অধিদফরের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইডিসিআর) থেকে পরীক্ষা করানো হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, তাদের ওষুধ ছাড়াও আরও কিছু মশার কীটনাশক পরীক্ষার জন্য দিয়েছেন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ফলে শেষ পর্যন্ত কোন ওষুধ ব্যবহার হবে সেটি নিয়ে সংশয় আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা আগের সিস্টেমেই (গঠিত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী) তো দিচ্ছি। এখন আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রেন্ডম (এলোমেলো) সিলেকশান করে কিছু ওষুধ নিয়েছেন। উনি নিজে নিজের মতো করে ওটা পরীক্ষাগারে পাঠিয়েছেন। এখন দেখা যাক কী হয়।’
তবে ডিএসসিসির একজন বিভাগীয় কর্মকর্তা ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘মশার ওষুধ নিয়ে ব্যাপক তৎপর স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি সিটি করপোরেশন এলাকায় ঘুরেছেনও। ওষুধ কাজ না হলে কিছু একটা করতেও পারেন মন্ত্রী।’
এএম/ক.ম