ঢাকা মেইল ডেস্ক
২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:১৯ পিএম
রাতে বাবার সামনে থেকেই কিশোরীকে তুলে নেয় স্থানীয় একদল যুবক। অনেক খোঁজাখুজি করে পরদিন বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে উদ্ধার করা হয় ওই কিশোরীর মরদহ।
নরসিংদীর মাধবদী এলাকার এই ঘটনা নিয়ে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যেমন আলোচনা-সমালোচনা চলছে, তেমনি নিন্দা জানানো হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে।
শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুর পর্যন্ত এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। যদিও এই ঘটনায় মূল অভিযুক্তকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি।
নরসিংদির মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন জানিয়েছেন, কিশোরী হত্যার ঘটনায় পাঁচজনকে গ্রেফতার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। অন্য চার অভিযুক্ত এখনও পলাতক, তাদেরকে ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওসি বলেন, ‘মূল অভিযুক্তকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। ঘটনার পর আসামিরা আত্মগোপনে চলে গেছে। আমরা জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে গোপন তথ্য ও মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছি।’
এদিকে আলোচিত এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ওই এলাকা পরিদর্শন করেছেন পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের উপ-মহাপরিদর্শক বা ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক। নিহতের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি জানান, এই ঘটনায় ধর্ষক হিসেবে চারজন এবং সালিশকারী হিসেবে পাঁচজনের নাম উল্লেখ করে মোট নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।
অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশের একাধিক টিম সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নরসিংদী জেলা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালাচ্ছে বলেও জানান ডিআইজি।
ঘটনা সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে
নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী কিশোরীকে অপহরণের পর ধর্ষণ ও হত্যার এই ঘটনায় ওই কিশোরীর মা বাদি হয়ে একটি মামলা করেছেন।
মামলার এজাহার ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরিশালের বাসিন্দা হলেও বাবার চাকরির সুবাদে মাধবদীতে একটি ভাড়া বাসায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতো নিহত কিশোরী।
এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, দুই সপ্তাহ আগে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় বখাটে যুবক নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরাসহ কয়েকজন ওই কিশোরীকে তুলে নিয়ে ধর্ষণ করেছে। ঘটনাটি এলাকার সাবেক ওয়ার্ড মেম্বারসহ স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে মীমাংসার চেষ্টা করা হয়।
যদিও এরপর থেকেই ওই কিশোরী এবং তার পরিবারের জটিলতা আরও বাড়ে। স্থানীয় নেতাদের কাছে অভিযোগ করায় তাদেরকে নানাভাবে হুমকি দেওয়া শুরু করে ওই যুবক এবং তার সহযোগীরা। এছাড়া কিশোরীর পরিবারকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় ওই কিশোরীকে খালার বাড়িতে রেখে আসার জন্য রওয়ানা হন তার বাবা। স্থানীয় বিলপাড় এলাকায় পৌঁছলে মামলার প্রধান আসামি নূরার নেতৃত্বে ছয়জন বখাটে পথরোধ করে বাবার সামনে থেকেই কিশোরীকে তুলে নিয়ে যায়। পরদিন তার মৃতদেহ পাওয়া যায় গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে। কিশোরীর মায়ের করা মামলায় এই বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
সালিশ হয়েছিল স্থানীয় বিএনপি নেতার নেতৃত্বে
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী আইয়ুব খান জানান, ধর্ষণের বিচার চাইতে গিয়েই মূলত তোপের মুখে পড়ে ওই কিশোরী এবং তার পরিবার। স্থানীয় ইউপির সাবেক মেম্বারসহ কয়েকজন বিচারের দায়িত্ব নিলেও পরবর্তীতে তাদেরকেই এলাকা ছাড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় ইউপি মেম্বার অপরাধীদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাৎ করেন এবং কোনো বিচার না করেই ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একজন বাসিন্দা বলেন, একদিকে ঘটনাটি যেকোনো উপায়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছিল। অন্যদিকে বিচার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, অপহরণ ও ধর্ষণের ঘটনায় বিচার চেয়ে কিশোরীর পরিবার স্থানীয় মহিষাশুড়া ইউনিয়ন পরিষদের নয় নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও ইউনিয়ন বিএনপির নেতা আহম্মদ আলী দেওয়ানের কাছে বিচার চেয়েছিল।
এই ঘটনায় নিহতের মায়ের করা মামলায় এখন পর্যন্ত যে পাঁচজনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে তার মধ্যে ওই বিএনপি নেতাও রয়েছেন। এছাড়া তার ছেলে ইমরান দেওয়ান, মূল অভিযুক্ত নূর মোহাম্মদ ওরফে নূরার চাচাত ভাই মোহাম্মদ আইয়ুব, একই এলাকার এবায়দুল্লাহ এবং হোসেন বাজার এলাকার গাফফার নামে একজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
শুক্রবার ওই এলাকা পরিদর্শন শেষে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, বেশ আগে থেকেই এই ঘটনা ঘিরে নানা কিছু ঘটলেও ভুক্তভোগীর পরিবার আগে থানায় কোনো অভিযোগ করেননি।
‘আমরা তাদেরকে বলেছি থানায় কেন বললেন না, থানায় যদি অভিযোগ করতো তাহলে এমন পরিস্থিতি হয়তো এড়ানো যেত’, বলেন ডিআইজি।
এই ঘটনায় গ্রেফতার পাঁচজনকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। পরে তাদেরকে জেল হাজতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মেছকাতুল ইসলাম।
পুলিশের একাধিক দল বাকি আসামি গ্রেফতারের চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছেন মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামাল হোসেন। ময়নাতদন্ত শেষে নিহত কিশোরীর মরদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। -বিবিসি বাংলা
ক.ম/