নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৪৮ পিএম
২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পিলখানায় তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বর্তমানে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) সদর দফতরে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ভয়াবহ কালো অধ্যায়। ওই ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। আকস্মিক ওই হত্যাযজ্ঞ পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দেয়।
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে দীর্ঘ ১৬ বছর পর অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পিলখানার ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক বিদ্রোহ ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত ষড়যন্ত্র।
সাড়ে তিন হাজারের বেশি পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ঘটনাটির পেছনে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রশাসনিক ব্যর্থতা, বাহিনীর অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ, গোয়েন্দা ত্রুটি এবং বিদেশি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগসহ বিস্তৃত বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছিল।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনীকে কাঠামোগতভাবে দুর্বল করা এবং তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার পথ সুগম করা। প্রতিবেদনে উত্থাপিত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো-এই জঘন্য কর্মকাণ্ডে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ দলগতভাবে জড়িত ছিল।
২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে কমিশন তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ
স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্বরোচিত ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন। তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপসকে ‘মূল সমন্বয়কারী’ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে। তার অনুমতি ছাড়া এত বড় আকারের পরিকল্পিত বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়া কঠিন ছিল। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ‘গ্রিন সিগন্যাল’ থাকায় প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর নীরবতা ছিল।
বিভিন্ন সাক্ষ্য ও জবানবন্দিতে আরও কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন। এছাড়া তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ’র নামও একাধিক সাক্ষ্যে উঠে এসেছে বলে জানানো হয়।
নিরাপত্তা সংস্থার কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ
প্রতিবেদনে নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ এবং সাবেক ডিজিএফআই প্রধান জেনারেল আকবরের নাম রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে প্রাপ্ত সাক্ষ্য, নথি ও গোয়েন্দা তথ্য পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের অনেকেই পূর্বে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
বিদ্রোহের মূল সমন্বয়কারী
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পিলখানার বিদ্রোহের সময় মূল সমন্বয়কারী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সিনিয়র লেফটেন্যান্ট কর্নেল মাহবুবুর রহমান বিদ্যমান কমান্ড কাঠামোর মাধ্যমে বিদ্রোহের সময় কৌশলগত নির্দেশনা দিয়েছিলেন, যা কিছু ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপ সীমিত করেছে। সাক্ষ্য অনুযায়ী, কর্মকর্তাদের মধ্যে নির্দেশনার অস্পষ্টতা বিদ্রোহ মোকাবিলায় জটিলতা সৃষ্টি করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সামরিক কমান্ড ও তৎকালীন নির্দেশনার ঘাটতি বিদ্রোহের সময় একাধিক অফিসারকে বিভ্রান্ত করেছিল। উচ্চপদস্থ কমান্ডারের এই নির্দেশনা ও সমন্বয়ের অভাব বিদ্রোহের মাত্রা বাড়াতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া, সামরিক কমান্ড এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণের অভাবও এই পরিস্থিতিকে আরও নিয়ন্ত্রণহীন করেছে।
সৈনিকদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের যোগাযোগ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্রোহের সময় কিছু রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সৈনিকদের যোগাযোগ ছিল। এই সংযোগ বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রমকে প্রভাবিত করতে পারে, যদিও সরাসরি প্রমাণ সীমিত। কিছু কর্মকর্তার মাধ্যমে রাজনৈতিক নেতারা সৈনিকদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করেছিলেন। সংযোগের প্রকৃতি এবং পরিমাণ পুরোপুরি নির্ধারণ করা কঠিন, তবে এটি সামরিক শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব ব্যবস্থায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা
২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে দরবার শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিদ্রোহের মুখে পড়ে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস’র (বিডিআর) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদসহ ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা নিহত হন। সব মিলিয়ে ওই ঘটনায় প্রাণ হারান ৭৪ জন। দেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম ভয়াবহ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।
তদন্ত কমিশনের ভাষ্যমতে, অনেক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার আগে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়—কারও চোখ উপড়ে ফেলা, কারও হাত-পা ভেঙে দেওয়া এবং দীর্ঘ সময় ধরে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার মতো বিভীষিকাময় ঘটনার বর্ণনা পাওয়া গেছে। অনেককে কাছ থেকে গুলি করা হয় এবং মরদেহ গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার সময় কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েন। পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বাসভবনে লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে। আতঙ্কিত নারী ও শিশুদের কেউ কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবরুদ্ধ অবস্থায় ছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে দরবার হলের ঘটনাপ্রবাহ
সকাল আনুমানিক ৯টা ১০ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে বেল্ট ও টুপি ছাড়া ইউনিফর্ম পরা দুজন সৈনিক অস্ত্র হাতে মঞ্চে উঠে আসে। তাদের একজন মহাপরিচালককে লক্ষ্য করে রাইফেল তাক করে। উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করেন এবং সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই দরবার হলের ভেতরে ও বাইরে থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসতে শুরু করে। মুহূর্তেই সভাকক্ষ বিশৃঙ্খলায় ডুবে যায়; কর্মকর্তারা আশ্রয়ের চেষ্টা করেন এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একই সময় একটি ছাই রঙের গাড়িতে করে ইউনিফর্ম পরা কিন্তু র্যাংকবিহীন, লম্বা চুলের কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তি দরবার হলের আশপাশে আসে। তাদের উপস্থিতির পরপরই গোলাগুলির তীব্রতা বাড়ে।
বিদ্রোহের পূর্বপ্রস্তুতি ও বৈঠক
কমিশনের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে তৎকালীন সংসদ সদস্য শেখ ফজলে নূর তাপস নিয়মিতভাবে পিলখানায় যাতায়াত করতেন এবং কিছু সৈনিক ও ডিএডি (ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া এবং অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ নিয়ে আলোচনা করা হতো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ১৩ ফেব্রুয়ারি শেখ সেলিমের বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে সৈনিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে কর্মকর্তা পর্যায়ের সদস্যদের জিম্মি করার একটি পরিকল্পনা নিয়েও কথাবার্তা হয়। এসব তথ্য সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বয়ানের ভিত্তিতে উঠে এসেছে।
২২ অথবা ২৩ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্টদের জানানো হয় যে ওপরের মহল থেকে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ পাওয়া গেছে। যদিও এই দাবির স্বপক্ষে প্রত্যক্ষ লিখিত প্রমাণের বিষয়টি স্পষ্ট নয়। এছাড়া ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের একটি গোপন বৈঠকে ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র সংগ্রহ এবং কর্মকর্তাদের জিম্মি করার সিদ্ধান্ত হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
বিদেশি সম্পৃক্ততা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পিলখানার বিদ্রোহ ও তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কিছু তথ্য বিদেশি সম্পর্কিত সম্ভাবনার আলোচনাও উত্থাপন করেছে। সাক্ষ্য ও প্রতিবেদনে যে সূত্রগুলো পাওয়া গেছে, তাতে বিদেশি প্রভাব বা সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিতকরণ করা সম্ভব হয়নি, তবে বিষয়টি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে গুরুত্বসহকারে বিবেচিত হয়েছে।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিদ্রোহ মোকাবিলায় নিরাপত্তা পরিকল্পনা ও সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিতে কোনো সরাসরি ভারতীয় হস্তক্ষেপের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবুও কিছু তথ্য ও প্রেক্ষাপট এমন আভাস দিয়েছে যে, ভারতীয় কূটনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে অবচেতনভাবে সম্পর্কিত পদক্ষেপগুলোর সম্ভাবনা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা বাহিনী এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা এই দিকটি বিষয়ভিত্তিকভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন, তবে কার্যকর প্রমাণ না থাকায় এটি শুধুমাত্র সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই তথ্য ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নীতি ও সীমান্তসহ সহযোগিতা ব্যবস্থার জন্য মূল্যবান শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদ্রোহের তদন্তে কারাবন্দি সাক্ষীদের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই সাক্ষীদের দেওয়া তথ্য অনেক দিক নির্দেশ করে, তবে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়েছে।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, কারাবন্দি সাক্ষীরা সরাসরি বিদ্রোহে অংশগ্রহণ বা পর্যবেক্ষণ সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের বিবৃতির মাধ্যমে ঘটনার সময়কাল, সৈনিকদের কার্যক্রম এবং নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক তথ্য উদঘাটন করা সম্ভব হয়েছে।
কমিশনের দাবি অনুযায়ী, কারাবন্দি সাক্ষীদের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করা হয়েছে এবং কিছু অংশে এ তথ্য অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলে গেছে। যদিও সকল সাক্ষ্য সরাসরি প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়, তথাপি তা তদন্ত প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কারাবন্দি সাক্ষীদের তথ্য নিরাপত্তা বাহিনী, সামরিক কমান্ড এবং রাজনৈতিক প্রভাব সম্পর্কিত সিদ্ধান্তকে বিশ্লেষণে সহায়তা করেছে।
প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও কমান্ড সংকট
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্রোহের আগে ও চলাকালে তৎকালীন বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) সদর দফতরে কমান্ড ও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে একাধিক দুর্বলতা স্পষ্ট ছিল। সামরিক শৃঙ্খলা ও কমান্ড চেইনের কার্যকর প্রয়োগে ঘাটতি থাকায় পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায়। বিশেষ করে সদর দফতরের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দায়িত্ব বণ্টন ও তদারকিতে অসামঞ্জস্য ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, মহাপরিচালকের স্টাফ অফিসারের অস্বাভাবিক প্রভাব ও অতিরিক্ত কর্তৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন সাক্ষ্যে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তার ভূমিকা স্বাভাবিক প্রশাসনিক সীমা অতিক্রম করেছিল কি না-সে বিষয়ে একাধিক জবানবন্দিতে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যদিও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার কথা প্রতিবেদনে বিস্তারিত উল্লেখ নেই, তবুও তদন্তে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতাও পরিস্থিতি জটিল করে তোলে বলে কমিশনের পর্যবেক্ষণ। বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, তথ্যপ্রবাহে বিঘ্ন এবং অসন্তোষ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগের অভাব ছিল-এমন মন্তব্য উঠে এসেছে সাক্ষ্যে। এছাড়া তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর তদারকির ঘাটতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, বিডিআরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আধাসামরিক বাহিনীর ওপর নিয়মিত ও কার্যকর প্রশাসনিক নজরদারি থাকা প্রয়োজন ছিল। ‘রাইফেলস সপ্তাহ’-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানেও স্বরাষ্ট্র সচিবের অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব প্রশাসনিক শৈথিল্য ও কমান্ড সংকট সম্মিলিতভাবে একটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছিল, যা পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে আরও জটিল ও ভয়াবহ করে তোলে।
সেনাবাহিনী দুর্বল করা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, পিলখানার বিদ্রোহ প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতা কমিয়ে আনার বিভিন্ন প্রক্রিয়ার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। কমিশন বলছে, ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ও কমান্ড কাঠামোর অস্পষ্টতা শুধু অবস্থা জটিল করেছে না, বরং দীর্ঘমেয়াদিভাবে সেনাবাহিনীর কার্যক্ষমতাকে দুর্বল করার সম্ভাবনাও উন্মোচিত হয়েছে।
সাক্ষ্য অনুযায়ী, বিদ্রোহ মোকাবিলায় ব্যবহৃত বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রটোকল এবং সামরিক পদক্ষেপের বিলম্ব ও সীমাবদ্ধতা রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। যে সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বা দেরিতে নেওয়া হয়েছে, সামরিক এই ভুল কিছু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেও প্রতিফলিত করেছে। কিছু নিরাপত্তা নির্দেশনা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সেনাবাহিনীর সামরিক শক্তি সীমিত করার প্রভাব ফেলেছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি সেনাবাহিনীর স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সামরিক কমান্ডের মধ্যে বিভ্রান্তি, নির্দেশনার অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বিদ্রোহ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর কার্যকারিতা হ্রাস করেছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যদি সেনাবাহিনীর ক্ষমতা ও কার্যক্ষমতার ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত করা হতো, তবে বিদ্রোহের দ্রুত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হতো এবং প্রাণহানি কমানো যেত।
অপারেশন ডাল-ভাত ও অসন্তোষ
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৭-২০০৮ সালে পরিচালিত ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচি ঘিরে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম ও অসন্তোষের জন্ম নেয়, যা পরবর্তী সময়ে বাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষোভ সঞ্চারে ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মসূচিটির আওতায় প্রায় ৩৫৪ কোটি টাকার পণ্য ক্রয় করা হয়েছিল। বিপুল অঙ্কের এ ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও কার্যকর নজরদারির ঘাটতি ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নিম্নমানের পণ্য উচ্চ মূল্যে সরবরাহ, নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিলার বা দোকান বরাদ্দ এবং ক্রয়-বিক্রয় প্রক্রিয়ায় যথাযথ মনিটরিং না থাকার অভিযোগ একাধিক সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। কিছু জবানবন্দিতে দাবি করা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে অভিযুক্তদের অনেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও জবাবদিহির অভাব সৈনিকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করে। বাহিনীর সদস্যদের একটি অংশ মনে করতেন, তাদের নামে পরিচালিত কর্মসূচি থেকে প্রকৃত সুবিধা তারা পাচ্ছেন না।
এছাড়া সৈনিকদের ডেইলি এলাউন্স (ডিএ) কম পাওয়া, নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের ভাতা বিলম্বে পরিশোধ এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা নিয়ে অসন্তোষের কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব দাবি-দাওয়া উপেক্ষিত থাকায় ক্ষোভ ধীরে ধীরে সংগঠিত আকার ধারণ করে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ও প্রাপ্য সুবিধা না পাওয়ার অনুভূতি সম্মিলিতভাবে বাহিনীর ভেতরে এক ধরনের হতাশা ও বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করেছিল, যা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ছুটি, স্কুল ও অন্যান্য ইস্যু
বিডিআর সদস্যদের বাৎসরিক ছুটি এক মাসে সীমিত রাখা ছিল অন্যতম অভিযোগ। দীর্ঘমেয়াদি ছুটির সীমাবদ্ধতা সৈনিকদের মধ্যে অসন্তোষ জন্মায়। এ ছাড়া, ইংরেজি ভার্সন স্কুল প্রতিষ্ঠা ও পরবর্তীতে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একীভূতকরণ সম্পর্কিত সিদ্ধান্তও জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, এই প্রক্রিয়ায় পিতা-মাতার সন্তুষ্টি বা সৈনিকদের সুবিধার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্কুলে ভর্তি ফি হ্রাসের কারণে কিছু ভর্তিচ্ছুর স্বার্থ সংরক্ষণ হলেও প্রশাসনিক দিক থেকে ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে ওঠে। কমিশনের সাক্ষ্য অনুযায়ী, কিছু কর্মকর্তার অযথাযথ সিদ্ধান্ত ও অপব্যবস্থাপনার কারণে অসন্তোষের মাত্রা বেড়ে যায়। এছাড়া, ‘অপারেশন ডাল-ভাত’ কর্মসূচিতে সিস্টেম লস এবং অস্বাভাবিক শাস্তির ঘটনা সৈনিকদের মধ্যে অতিরিক্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। কিছু সৈনিক জানান, নির্ধারিত নিয়ম ভেঙে শাস্তি প্রদান ও আর্থিক ক্ষতি দলীয় মানসিকতা ও আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। এই সব ছোট-বড় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের সমষ্টি সৈনিকদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অসন্তোষ ও হতাশার জন্ম দেয়।
র্যাব ও নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫ ফেব্রুয়ারি পিলখানার ৫ নম্বর গেটে বিদ্রোহের সময় র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন মোতায়েন থাকলেও তারা সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। র্যাবের উপস্থিতি থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল রেজা নুরের নির্দেশনা বিদ্যমান ছিল, যা র্যাবের কার্যক্রম সীমিত করেছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কমান্ড ও যোগাযোগের অস্পষ্টতা, নির্দেশনার অভাব এবং নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপের দেরি বিদ্রোহকে আরও জটিল করে তোলে। র্যাব মোতায়েন থাকলেও তারা সশস্ত্র হামলা রোধ বা সেনা কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি। নিরাপত্তা বাহিনীর অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতা পরিস্থিতির ভয়াবহতা বৃদ্ধি করে। এর মধ্যে বিভ্রান্তি ও নির্দেশনা সংক্রান্ত অস্পষ্টতা ছিল, যার ফলে তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
বিডিআর থেকে বিজিবি রূপান্তর
পিলখানার বিদ্রোহের পরবর্তী প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ রাইফেলস’কে (বিডিআর) সীমান্তরক্ষা বাহিনী বিজিবিতে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা হয়েছিল। এই রূপান্তরের পরিকল্পনা এবং বাস্তবায়ন সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী হলেও কার্যক্রম চলাকালীন পদক্ষেপগুলোর ত্রুটি ও তদারকির অভাব বিদ্রোহের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রভাব ফেলেছিল। রূপান্তর প্রক্রিয়ার সময়ে কমান্ড ও যোগাযোগের অস্পষ্টতা বিদ্যমান ছিল। কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তৃত্ব সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব বিদ্যমান থাকার কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় অমসৃণতা দেখা দিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, রূপান্তর কার্যক্রম চলাকালীন কোনো পর্যায়ে সমন্বয়হীনতা এবং নির্দেশনার অভাব বিদ্যমান থাকার কারণে পিলখানায় বিদ্রোহ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। যদি রূপান্তর প্রক্রিয়ায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, নির্দেশনা ও সমন্বয় নিশ্চিত করা হতো, তবে বিদ্রোহের ভয়াবহতা অনেকাংশে কমানো যেত।
কমিশনের দাবি, কর্মকর্তাদের বিভ্রান্তি এবং রূপান্তর সংক্রান্ত অজ্ঞতা বিদ্রোহের সময় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধা সৃষ্টি করেছিল। এই প্রক্রিয়া ও রূপান্তরের সময় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় তদারকি ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফলেও ঘটেছে।
বিডিআর স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থা সংক্রান্ত পরিবর্তন
বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে বিডিআর স্কুল এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষাব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক একতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বিদ্রোহের পুনরাবৃত্তি রোধ করা।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, স্কুলে পাঠ্যক্রম, প্রশিক্ষণ পদ্ধতি এবং প্রশাসনিক নিয়মাবলীতে সংস্কার আনা হয়েছে। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে মানসিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রশিক্ষণের ওপর, যাতে সৈনিকরা রাজনৈতিক প্রভাব বা প্ররোচনার বাইরে থেকে নিজেদের দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করতে পারে।
কমিশনের দাবি অনুযায়ী, বিডিআর স্কুলে শিক্ষক ও প্রশিক্ষক নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় কঠোরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক শিক্ষা সীমিত করা হয়েছে এবং নিরাপত্তা ও নৈতিকতা বিষয়ক পাঠ্যক্রম সম্প্রসারিত করা হয়েছে।
এএইচ/এমআর