মো. মেহেদী হাসান হাসিব
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম
দেশে ২০১৪ সাল থেকে টানা তিনটি নির্বাচন ছিল চরম বিতর্কিত। আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ভোট পরিণত হয়েছিল চরম আতঙ্কের বিষয়ে। ভোট মানেই রক্তপাত, কারচুপি ও ক্ষমতা প্রদর্শন। এর জন্য ফ্যাসিস্ট তকমা পাওয়া আওয়ামী লীগের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনও ছিল সমানভাবে দায়ী। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি রোষানলে পড়ে নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। সাবেক দুজন প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কারাগারেও যেতে হয়।
সেই প্রেক্ষাপটে এবার নতুন নির্বাচন কমিশনের অধীনে দেশে অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সঙ্গে গণভোটও। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সব দলকে আস্থায় এনে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন করতে পারা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসি সেটা অনেকাংশে করতে সক্ষম হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে রক্তপাতহীন এই নির্বাচন দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। এতে দেশবাসীর পাশাপাশি সন্তুষ্ট নির্বাচন কমিশনও। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা একটি সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পেরে এখন অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে সময় কাটাচ্ছেন।
কোনো কোনো আসনে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কিছু অভিযোগ আসছে। এমনকি ভূমিধস বিজয় পাওয়া বিএনপিও কিছু অভিযোগ করেছে। তবে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিনে দেশজুড়ে নির্বাচন করতে গিয়ে ছোটখাটো কিছু অভিযোগ আসা অস্বাভাবিক কিছু নয়। যেসব অভিযোগ এসেছে বিধি অনুযায়ী এর সুরাহা করা হবে। তবে মোটাদাগে নির্বাচনে কারচুপি বা বাধা প্রদানের কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। দেশে-বিদেশি পর্যবেক্ষকরাও নির্বাচনকে ঐতিহাসিক বলে আখ্যা দিয়েছেন।

নির্বাচনের ব্যাপারে ইসি সংশ্লিষ্টদের কথায় একটি তৃপ্তিবোধ লক্ষ্য করা গেছে। ভোট শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেছেন, নির্বাচনে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকবেই। ১৮ কোটি ভোটারের দেশ। আপনাদের সহযোগিতা না হলে এই সুন্দর নির্বাচন উপহার দিতে পারতাম না। সবার কাছে কৃতজ্ঞ। অনেক দেশে সাড়ে ১৭ লাখ লোকও নেই। অথচ এই পরিমাণ লোক নির্বাচন আয়োজনে কাজ করেছে। নির্বাচনকে পারফেক্ট বলবো না। পারফেক্ট নির্বাচন কখনো না। তবে অতীতের তুলনায় যেকোনো মানদণ্ডে এই নির্বাচন ভালো হয়েছে। ভোট গুনতে একটু সময় লাগছে। আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছ থাকতে চাই। লুকোচুরিতে বিশ্বাস করি না।
সিইসি বলেন, আমাদের কষ্ট, চেষ্টা সার্থক হয়েছে। নির্বাচনের ইতিহাসে যেকোনো মানদণ্ডে ভালো নির্বাচন। নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দিতে পেরেছি।
নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেন, ১৩ ফেব্রুয়ারির সকালটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি শুভ সকাল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। গণতান্ত্রিক নবযাত্রায় এই নির্বাচন জাতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। নির্বাচন কমিশনের একটাই কমিটমেন্ট ছিল। সেটি হচ্ছে, নির্মোহভাবে আইন প্রয়োগ করে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দেওয়া। সেই লক্ষ্যেই শতভাগ চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়ে থাকলে তা অনিচ্ছাকৃত। এই নির্বাচন শুধু একটি সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল না, বরং একটি পবিত্র আমানত হিসেবে কমিশন তা গ্রহণ করেছিল।
দেশবাসীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণ ঈদ উৎসবের মতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছেন। এর ফলে সব আশঙ্কা ও শঙ্কা দূর হয়েছে এবং জাতি হিসেবে বাংলাদেশ বিজয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র যেন কখনোই নির্ধারিত পথ থেকে বিচ্যুত না হয় এবং ভবিষ্যতে আরও ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপনের প্রত্যাশাও তিনি জানিয়েছেন।
নিবন্ধিত ৬০টি দলের মধ্যে ভোটে অংশ নিয়েছে ৫০টি দল। ২৯৯ আসনের ভোটে ৬০টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫০টি দল অংশগ্রহণ করেছে। এরমধ্যে ২৯৭টি আসনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করেছে ইসি। চট্টগ্রাম-২ ও চট্রগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হবে আদালতের মামলা নিষ্পত্তির পর।

ইসির ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী এবারের নির্বাচনে ২৯৭টি আসনে ভোটা পড়েছে ৫৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ। আর গণভোটে ২৯৯ আসনে ভোট পড়েছে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি। আর ‘না’ ভোটের পক্ষে ভোট পড়েছে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট।
নির্বাচনে বিএনপি আসন পেয়েছে ২০৯টি। জামায়াতে ইসলামী পেয়েছে ৬৮টি। এনসিপি ৬টি। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন পেয়েছে ১টি। গণঅধিকার পরিষদ পেয়েছে ১টি। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও খেলাফত মজলিস পেয়েছে ১টি করে আসন। অন্যদিকে জাতীয় পার্টিসহ ৪১টি দল কোনো আসনই পায়নি।
এমএইচএইচ/জেবি