images

জাতীয়

তরুণদের হাতেই এবারের নির্বাচনের ভাগ্য!

সাখাওয়াত হোসাইন

১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৮ পিএম

সারাদেশে চলছে ভোট উৎসবের প্রস্তুতি। পাড়ায় মহল্লায় সবখানে চলছে ভোটের আনন্দ। এবারের ভোটারদের বড় একটি অংশ তরুণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারুণ্যের ভোট বড় ফ্যাক্টর হবে। তরুণদের বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। প্রথমবারের মতো তারা ভোট দেবেন। তাই ভোট ঘিরে তাদের রয়েছে বাড়তি উচ্ছ্বাস।

ধারণা করা হচ্ছে, ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ কোটিই তরুণ। ফলে নির্বাচনি লড়াইয়ে তাদের গুরুত্ব থাকাটাই স্বাভাবিক। সেই গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান। কারণ, এর নেতৃত্বে ছিলেন তরুণেরা। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হার–জিত তরুণ ও নতুন ভোটাররাই নির্ধারণ করে দিতে পারেন বলে ‍মনে করা হচ্ছে।

এই তরুণ ভোটারদের ভোট কার বাক্সে যাবে, তা আগাম ধারণা করা কঠিন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দ্বারা তাদের প্রভাবিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ‘ডিজিটাল’ এই প্রজন্মের ভোট টানতে রাজনৈতিক দলগুলোও নতুন কৌশল সাজাচ্ছে।

ভোটারের পরিসংখ্যান: তরুণদের সংখ্যাগত শক্তি

পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দেশে মোট ভোটার ছিল ৮ কোটি ১০ লাখ ৮৭ হাজার ৩ জন। নির্বাচন কমিশনের ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভোটার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ১৮৩ জনে। অর্থাৎ গত ১৭ বছরে ভোটার বেড়েছে ৪ কোটি ৬৬ লাখের বেশি। এর মধ্যে নারী ভোটার সংখ্যা ৬ কোটি ২৮ লাখ ৭৯ হাজার ৪২ জন।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ভোটার প্রায় সাড়ে ৪ কোটি। জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী এই বয়সসীমাকেই ‘যুব’ বা তরুণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

আরও পড়ুন

ফাঁকা ঢাকা, ভোট উৎসবের জন্য প্রস্তুত নগরবাসী

ইসির বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী ভোটারই প্রায় ৪ কোটি ৩২ লাখ। এর মধ্যে ১৮-২১ বছর বয়সী নতুন ভোটার ৮৫ লাখের বেশি; ২২-২৫ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ; ২৬-২৯ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ২১ লাখ; ৩০-৩৩ বছর বয়সী প্রায় ১ কোটি ৬ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই তরুণ জনগোষ্ঠী- যারা যেকোনো নির্বাচনি আসনের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।

ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী নাজমুল হাসান। ভোট দেওয়ার উদ্দেশে ক্যাম্পাস ছেড়েছেন এবং এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কাকে ভোট দেবেন। তবে তিনি মন স্থির করে রেখেছেন, ভালো প্রার্থীকে ভোট দেবেন। জানতে চাইলে তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি এবারই ভোটার হয়েছি এবং প্রথমবারের মতো ভোটাধিকার প্রয়োগ করবো। তবে কাকে বা কোন দলকে ভোট দেবে সেই সিদ্ধান্ত এখনো নিইনি, আরো দেখার বাকি আছে। এর কারণ, এখনো তো দলগুলো ইশতেহার ও প্রার্থী দেখেছি। আর ভোটের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক চলছে।’

এই শিক্ষার্থী আরও বলেন, ‘আমি প্রচলিত দলগুলো নিজেদের মতো করে চিন্তা করছে। আমি একটি পরিবর্তন প্রত্যাশা করছি। পুরনো ধাঁচের রাজনীতি আর সরকার দেখতে চাই না। আমি পরিবর্তন চাই। এটা যারা করতে পারবে এবং আমি বিশ্বাস রাখতে পারবো, তাদেরই আমি ভোট দেবে।’

‘আরেকটি বিষয়, আমাদের তরুণদের কিছু আকাঙ্ক্ষা আছে, যা ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে মাধ্যমে প্রকাশ করেছি। আমি সেই প্রত্যাশা পূরণ হোক তা চাই,’ বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

শুরু হলো টানা ৪ দিনের সরকারি ছুটি

এবার প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ওয়ালিদ বিন হাবিব। ভোট নিয়ে রয়েছে তার নানা প্রত্যাশা। তবে দেশের ক্ষমতা কাঠামোতে পরিবর্তন ও অনিয়ম রোধে বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

জানতে চাইলে ওয়ালিদ বিন হাবিব ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমি দেশে বড় ধরনের সংস্কার ও পরিবর্তন চাই। আগে যে দলীয় সরকার, যারা দলীয় লোকজনকে নিয়ে লুটপাট করত, দুর্নীতি করত, সেই ধরনের কোনো সরকার আবার চাই না। আমি চাই সরকার হবে সবার। কিন্তু আমি এরই মধ্যে কিছুটা হতাশও হয়ে পড়েছি। কারণ, আমরা নির্বাচনের আগে যে সংস্কার চেয়েছিলাম, তার পুরোটা হয়েছে বলে মনে হয় না। তারপরও আমি এমন দলকে ভোট দেব, যারা ক্ষমতায় এসে সংস্কারগুলো করবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘নারী, তরুণ, সংখ্যালঘুদের অধিকারের বিষয়গুলো আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সেইসঙ্গে নিরাপত্তা, দ্রব্যমূল্য এবং দেশের সংস্কার। এছাড়া আমাদের যে বাক স্বাধীনতা, ওইটা যেন এখনের মতো ঠিক থাকে- এটাই আমরা চাই। আর আমাদের যাতে মেয়ে হিসেবে নিরাপত্তাটা নিশ্চিত করা হয়।’

আরেক তরুণ ভোটার মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি তো এবার তরুণ প্রার্থীদেরই ভোট দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু তাদের দলের কাছ থেকে আমার প্রত্যাশা এখনো পূরণ হচ্ছে না। তাদের আরও ইফেক্টিভ হতে হবে। আর অন্য দলগুলোও এখন নানা দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছে। যে পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল, তা এখনো দেখতে পাচ্ছি না। তারপরও আমি পরিবর্তন চাই। নতুন কিছু দেখতে চাই। পুরনো ধারার রাজনীতি আমার পছন্দ নয়।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেসবাহ্ উদ্দিন বলেন, ‘রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন আশা করা ঠিক হবে না। তবে আমি বিশ্বাস করি, সৎ ও দায়িত্বশীল নেতৃত্ব নির্বাচিত হলে ধীরে ধীরে ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব। জনগণ যদি সচেতনভাবে এবং দায়িত্বের সঙ্গে ভোট দেয়, তাহলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন আসবে। সময়ের সঙ্গে দেশ সত্যিকারের উন্নয়ন ও ইতিবাচক পরিবর্তনের সাক্ষী হতে পারবে।’

Vote3
এবার বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার ভোট দেবেন। ছবি: ঢাকা মেইল

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লিটন আহমেদ বলেন, ‘আমি অতীত দেখলে প্রার্থীর অতীত দেখবে। তারা আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো পূরণ করেছে কি না। কথার সাথে কাজের মিল আছে কি না। ভবিষ্যতে তারা আমাদের জন্য কী করবে সেটাকেই আমি প্রাধান্য দেব।’

আরও পড়ুন

ইসলামি দলের সবচেয়ে বেশি প্রার্থী এবারের ভোটে

মূলত, কর্মসংস্থান কীভাবে তৈরি হবে, শিক্ষা কতটা কর্মমুখী হবে, দক্ষতা কীভাবে বাড়বে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কতটা জবাবদিহিমূলক হবে, মতপ্রকাশ কতটা সুরক্ষিত থাকবে, সেইসাথে উদ্যোক্তা উন্নয়ন, পরিবেশ, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান- এই বিষয়গুলো তরুণদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কোন বাক্সে তরুণ ভোট

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আইনুল ইসলামের মতে, বড় একটি অংশের তরুণ ভোটার গত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট দিতে পারেনি। ফলে অনেক তরুণের কাছেই এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে তরুণদের দৃশ্যমান ভূমিকা। তিনি বলেন, এই তরুণরা কী সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাও আগেভাগে বলা যাচ্ছে না। তাদের মন বোঝা রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সহজ নয়।

এদিকে বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে তরুণদের সরব উপস্থিতি রয়েছে। ফলে এবারের নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচারকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলো। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও এক্সের মতো প্ল্যাটফর্মে তরুণরা দল ও প্রার্থীদের কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, মতামত জানাচ্ছেন এবং সমালোচনা করছেন।

এসএইচ/জেবি