আব্দুল হাকিম
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৫:৫৫ পিএম
# অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৫৩.৫ শতাংশ বেশি
# ল্যাব স্থাপন খাতেই প্রায় ১১০০ কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব
# দ্বিতীয় সংশোধনীতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৮৯০ কোটি টাকা
# প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদন ব্যয় ছিল ১৫০৩ কোটি টাকা
# সীমিত অগ্রগতির প্রকল্পে এত বড় ব্যয় বৃদ্ধি বিতর্ক তৈরি করেছে
চার বছর আগে যাত্রা শুরু করা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি (বিফট)-এর প্রাথমিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। মেয়াদ অতিক্রমের এক-তৃতীয়াংশ পার হলেও কাজের মাত্র ১৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। সীমিত অগ্রগতির মধ্যেই তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দেড়গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে, যা সরকারের সংকুচিত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
দ্বিতীয় সংশোধনী প্রস্তাব অনুসারে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে তিন হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। এটি বর্তমানে অনুমোদিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, মূল প্রকল্প ব্যয়ের তুলনায় এই বৃদ্ধির হার দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৫৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা সাম্প্রতিক সময়ে কোনো শিক্ষা বা গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পের জন্য বিরল ঘটনা।
প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র
বিফটের প্রাথমিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ। কাজ শুরু হয় ২০২২ সালের জানুয়ারিতে। শুরুতে প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৫০৩ কোটি টাকা এবং মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় সামান্য বাড়িয়ে এক হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা করা হলেও সময়সীমা অপরিবর্তিত রাখা হয়। কিন্তু দ্বিতীয় সংশোধনীতে এক লাফে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় তিন হাজার ৮৯০ কোটি টাকায় এবং মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরিকল্পনা কমিশন মনে করছে, এত বড় ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির পেছনে প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, পরিকল্পনার ঘাটতি বা প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অভাবই রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, সরকারের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি চাপে থাকা অবস্থায় এমন বড় ব্যয় বৃদ্ধি উদ্বেগজনক। বিষয়টি যাচাই করতে কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগ আগামী সপ্তাহে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির একটি বৈঠক ডেকেছে। বৈঠকে প্রকল্পের যৌক্তিকতা, ব্যয় কাঠামোর বাস্তবতা, অর্থায়নের সক্ষমতা এবং ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাব্যতা নিয়ে কঠোর আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে বৈঠকের জন্য প্রস্তুত করা কার্যপত্রে মোট ২১টি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়েছে।
পর্যবেক্ষণগুলোতে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, প্রকল্পের বিভিন্ন উপাদানে বরাদ্দের যৌক্তিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় এই প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান বর্তমানে নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্প সংশোধনের মাধ্যমে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি হলে তার যুক্তি সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
ব্যয় বৃদ্ধির ব্যাখ্যা
প্রকল্পের পরিচালক ড. মো. মনসুর আলম জানিয়েছেন, প্রাথমিক পরিকল্পনায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। পরবর্তীতে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চালানোর পর দেখা যায়, ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজির মতো উন্নত ও গবেষণাভিত্তিক কাজ করতে হলে আগের সীমিত বাজেটে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর একটি নতুন নকশা ও ডিজাইন তৈরি করা হয়েছে। নতুন পরিকল্পনায় চারটি ক্লাস্টারে প্রায় ১৮টি আধুনিক ল্যাবরেটরি নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এসব ল্যাবরেটরি অত্যন্ত উন্নতমানের হবে এবং শুধু এই ল্যাব স্থাপন খাতে প্রায় এক হাজার ১০০ কোটি টাকার ব্যয় ধার্য করা হয়েছে।
কোথায় কত টাকা ব্যয়
সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় ব্যয়ের বিস্তারিত তালিকা নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সংযোগ, উপকেন্দ্র, সাবস্টেশন, জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, অভ্যন্তরীণ বৈদ্যুতিক লাইন, ইন্টারনেট ও ওয়াটার সাপ্লাইয়ের জন্য নতুন করে প্রায় ৩৬ কোটি টাকার ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে এর আগে কোনো বরাদ্দ ছিল না।
আরও পড়ুন: প্রতিদিন কমছে কৃষিজমি, সংকটে কৃষক
নিরাপত্তা ও সহায়ক অবকাঠামো খাতেও বড় অঙ্কের ব্যয় যুক্ত হয়েছে। গেট, সীমানা প্রাচীর, সিকিউরিটি পোস্ট, ফায়ার স্টেশন ভবন, নেটওয়ার্ক রুম, সার্ভার রুম, ডেটা সেন্টার, ডিসিপি ও কন্ট্রোল সেন্টার নির্মাণে প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া বুয়েট ক্যাম্পাসে আইআইটি ভবন ও শিক্ষক পুনর্বাসন ভবনের জন্য প্রায় ৬৪৩ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। মেডিকেল সরঞ্জাম বাবদ নতুন করে প্রায় দুই কোটি ৩২ লাখ টাকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান, নকশা, ডিজাইন ও মনিটরিং খাতে ব্যয় ১০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রস্তাবিত হয়েছে প্রায় ৫২ কোটি টাকা, ফলে শুধু এই খাতেই ব্যয় বৃদ্ধি হয়েছে প্রায় ৪২ কোটি টাকা। কম্পিউটার ও অফিস সরঞ্জাম মেরামত খাতে ধরা হয়েছে ৫০ কোটি টাকা।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, গত বছরের নভেম্বরে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ একটি প্রাথমিক সংশোধনী প্রস্তাব জমা দিয়েছিল, যেখানে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল তিন হাজার ৫৮১ কোটি টাকা। সে সময় কমিশন ব্যয় কমানো অথবা অসমাপ্ত কাজ বিবেচনায় প্রকল্পকে উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বাদ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নতুন প্রস্তাব জমা দিতে গিয়ে বিভাগটি ব্যয় আরও ৩৯০ কোটি টাকা বাড়িয়েছে, যা কমিশনের আগের সুপারিশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক অবকাঠামোর জন্য সাধারণত যে ব্যয় ধরা হয়, তার তুলনায় শুধু এই প্রাথমিক অবকাঠামো প্রকল্পের ব্যয় প্রায় পাঁচগুণ বেশি হওয়া স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিফট প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটও আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১৬ সালে অনুমোদন পেয়েও এখনো নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে চারটি বিভাগ গাজীপুরে ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার লক্ষ্যে জমি অধিগ্রহণ ও প্রাথমিক অবকাঠামোর জন্য আলাদাভাবে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পর্যালোচনাধীন। ফলে একদিকে সীমিত অগ্রগতির প্রকল্পে বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব, অন্যদিকে নতুন প্রকল্প—এই দুইয়ের সমন্বয় নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এএইচ/এমআর