আব্দুল হাকিম
০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০:৩৯ এএম
# ব্যাটারিচালিত রিকশার আয় দ্বিগুণ, ঋণও চার গুণ
# যানজটের জন্য ব্যাটারি রিকশাকেই দায়ী করছেন ৬২ শতাংশ যাত্রী
# যাত্রীদের দৈনিক যাতায়াত ব্যয় কমলেও বেড়েছে ঝুঁকি
# ব্যাটারিচালিত রিকশা ঋণ নিয়ে কিনছেন ৬০ শতাংশ মানুষ
# নীতিমালা না থাকলে নগর পরিবহন সংকট গভীর হবে
ঢাকার রাস্তায় নীরবে কিন্তু দ্রুত বদলে যাচ্ছে রিকশার চেনা ছবি। একসময় প্যাডেলচালিত রিকশা স্বল্প দূরত্বের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম থাকলেও আজ সেই জায়গা অনেকটা দখল করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। এই পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্টে যাচ্ছে চালকদের বয়স ও অভিজ্ঞতা, যাত্রীদের পছন্দ, গ্যারেজ মালিকদের ব্যবসা-এমনকি নগর যানজট ও সড়ক নিরাপত্তার বাস্তবতাও।
সাম্প্রতিক ইনোভিশন নামে একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা যায়, প্যাডেল থেকে ব্যাটারিতে রূপান্তর হওয়া রিকশা ঢাকার নগর পরিবহন ব্যবস্থাকে নতুন সংকট ও সম্ভাবনার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। গবেষণায় ব্যাটারিরিকশা ও প্যাডেল রিকশার মধ্যে চালকদের সামাজিক প্রেক্ষাপট, আয়-ব্যয় এবং পেশাগত ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে তুলে ধরা হয়।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় পরিচালিত এই গবেষণায় ৩৪৮ জন চালক, ৩১২ জন যাত্রী ও ৬৩ জন গ্যারেজ মালিকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণার ফলাফল অনুযায়ী, ব্যাটারি রিকশাচালকদের গড় বয়স ৩৮ বছর, যাদের ৭৫ শতাংশই নতুন। তাদের গড় অভিজ্ঞতা মাত্র ২ দশমিক ৫ বছর। অন্যদিকে, প্যাডেল রিকশাচালকদের গড় বয়স ৪২ বছর এবং অভিজ্ঞতা প্রায় ১৫ বছর। প্রায় ৯৭ দশমিক ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, রিকশা চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই। এই নিয়ন্ত্রণহীনতার সুযোগেই ব্যাটারি রিকশার বিস্তার দ্রুত ঘটছে।
আয় ও খরচ
আয়ের ক্ষেত্রে ভাড়া করা রিকশায় প্যাডেল রিকশা কিছুটা এগিয়ে। ভাড়া করা প্যাডেল রিকশায় গড়ে দৈনিক নিট আয় ৪৮৪ টাকা, যেখানে ব্যাটারি রিকশায় তা ৪১৮ টাকা। তবে নিজস্ব মালিকানাধীন রিকশার ক্ষেত্রে চিত্র উল্টো। নিজস্ব ব্যাটারি রিকশায় গড় দৈনিক নিট আয় প্রায় ৯৭০ টাকা, আর প্যাডেল রিকশায় ৫৩০ টাকা।
আরও পড়ুন: ২ দশক পর আজ বরিশাল যাচ্ছেন তারেক রহমান
গবেষণায় বলা হয়, খরচের দিক থেকে ব্যাটারি রিকশা তুলনামূলক সাশ্রয়ী। ব্যাটারি রিকশার দৈনিক গড় খরচ ১০৭ দশমিক ৭৩ টাকা, প্যাডেল রিকশায় ১৩৪ দশমিক ৮৭ টাকা। কিন্তু এই কম খরচের আড়ালে রয়েছে ঋণের বড় চাপ। ব্যাটারি রিকশাচালকদের গড় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭৯ হাজার ৯২৭ টাকা, যেখানে প্যাডেল রিকশাচালকদের গড় ঋণ মাত্র ১৮ হাজার ৬৫৪ টাকা। এ ছাড়া ব্যাটারি রিকশাচালকদের প্রায় ৫৯ দশমিক ৭০ শতাংশ মাইক্রোফাইন্যান্সের ওপর নির্ভরশীল, যা তাদের আর্থিক ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি ব্যাটারি রিকশায়
জরিপ অনুযায়ী, ব্যাটারি রিকশাচালকদের ৩০ শতাংশ দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন, যেখানে প্যাডেল রিকশায় এই হার ১৮ শতাংশ। গুরুতর বা খুব গুরুতর আঘাতের হার ব্যাটারি রিকশায় ৪৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, প্যাডেল রিকশায় ২৯ দশমিক ৬০ শতাংশ।
প্রতিষ্ঠানটির গবেষণায় দেখা গেছে, যাত্রীদের কাছে ব্যাটারি রিকশা এখন প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হয়ে উঠছে। প্রায় ৮২ শতাংশ যাত্রী দ্রুত যাতায়াতের জন্য ব্যাটারি রিকশা বেছে নেন। যাত্রীদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ব্যাটারি রিকশা তুলনামূলক দ্রুত, সস্তা ও সহজলভ্য। আয়ের দিক থেকে যাত্রীদের একটি বড় অংশ মধ্যম আয়ের।
গবেষণা অনুযায়ী, ৬৩ শতাংশ যাত্রী মাসে ২০ হাজার ১ টাকা থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করেন এবং তারা স্বল্প দূরত্বে ব্যাটারি রিকশাকেই বেশি উপযোগী মনে করেন।
-6_20260204_105142683.jpg)
মালিকদের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনের স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। প্রায় ৩৫ শতাংশ মালিক ইতোমধ্যে তাদের প্যাডেল রিকশা ব্যাটারি রিকশায় রূপান্তর করেছেন। আবার ৮১ শতাংশ উদ্যোক্তা প্যাডেল রিকশা দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও বর্তমানে ৬২ শতাংশ ব্যাটারি রিকশাকেই বেশি লাভজনক মনে করছেন।
ব্যাটারি রিকশার ক্ষেত্রে বারবার মেরামতের প্রয়োজন একটি বড় সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। প্রায় ৩৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন, নিয়মিত মেরামত তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ খরচকে বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রায় ৩০ দশমিক ১৬ শতাংশ।
নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে জনমত স্পষ্ট। ২১ দশমিক ৯০ শতাংশ ব্যাটারি রিকশার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার পক্ষে। তবে প্রায় ৩৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, নিয়ন্ত্রিতভাবে চলাচলের পক্ষে মত দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সমর্থন পাওয়া প্রস্তাব হলো-ব্যাটারি রিকশা শুধু সেকেন্ডারি সড়কে চলাচলের অনুমতি দেওয়া।
যাত্রীদের দিক থেকেও ব্যাটারি রিকশার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। মাসিক ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করা যাত্রীরাই সবচেয়ে বেশি রিকশা ব্যবহার করছেন। এদের বড় অংশ তরুণ ও কর্মজীবী। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোই ব্যাটারি রিকশা ব্যবহারের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। গবেষণায় দেখা যায়, ৭৪ শতাংশ যাত্রী গতি ও সময় বাঁচানোর জন্য ব্যাটারি রিকশা বেছে নেন। এতে যাত্রীদের দৈনিক যাতায়াত ব্যয়ও কমেছে। প্যাডেল রিকশায় যেখানে গড় দৈনিক ব্যয় প্রায় ১৩৫ টাকা, ব্যাটারি রিকশায় তা কমে প্রায় ১০৮ টাকায় নেমেছে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালেই বাড়ছে বড় ঝুঁকি। দুর্ঘটনার হার ব্যাটারি রিকশায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
খরচ-সময় বাঁচলেও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেশি ব্যাটারি রিকশায়
যাত্রীদের ৩০ শতাংশ ব্যাটারি রিকশায় দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। আর প্যাডেল রিকশায় এই হার ১৮ শতাংশ। গুরুতর ও খুব গুরুতর আঘাতের ঘটনাও ব্যাটারি রিকশায় বেশি। একই সঙ্গে যানজটের জন্যও ব্যাটারি রিকশাকেই দায়ী করছেন বেশিরভাগ নগরবাসী।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬২ শতাংশ যাত্রী মনে করেন, ঢাকার যানজট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি রিকশা।
প্যাডেল ছেড়ে ব্যাটারিতে ঝুঁকছেন মালিকরা
গ্যারেজ মালিকদের ব্যবসায়িক হিসাবও এই পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। প্যাডেল রিকশার দৈনিক ভাড়া যেখানে গড়ে ১৩২ টাকা, ব্যাটারি রিকশায় তা বেড়ে ৪১৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। ফলে আয় বাড়ার আশায় গ্যারেজ মালিকরা প্যাডেল ছেড়ে ব্যাটারিতে ঝুঁকছেন। ইতোমধ্যে ৩৫ শতাংশ গ্যারেজ মালিক তাদের প্যাডেল রিকশা ব্যাটারিতে রূপান্তর করেছেন। তবে উচ্চ রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও ঘন ঘন মেরামতের প্রয়োজন তাদের বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে।
ঢাকার রাস্তায় প্যাডেল থেকে ব্যাটারিতে এই রূপান্তর একদিকে চালক ও যাত্রীদের জন্য গতি ও আয়ের সুযোগ বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে বাড়াচ্ছে দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি। নিয়ন্ত্রণ ও নীতিমালার বাইরে এই প্রবণতা চলতে থাকলে নগর পরিবহন সংকট আরো গভীর হবে বলেন মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ভয়েস ফর রিফর্মের উদ্যোক্তা ও সংগঠক ফাহিম মাসরুর বলেন, ‘রাজধানীতে ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ব্যাটারিচালিত রিকশা বেড়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে অনেক ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। কিন্তু সরকার হয়তো কোনো একটা দিক বিবেচনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার চালক ও মালিকদের কিছুটা ছাড় দিয়েছে। এর ফলে এটা অনেক বেড়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা অনেক ধরনের সমস্যা তৈরি করছে। অনেকেই সাময়িক বেকারত্ব কাটাতে এই পেশায় যুক্ত হন। তাই তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিতের পাশাপাশি পুরো খাতটিকে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনায় নিয়ে আসতে হবে।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের (ইউআরপি) অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকার সড়কগুলোতে যাতায়াতের পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং এর সমাধান কেবল রিকশার মধ্যে খুঁজলে ভুল হবে। ঢাকায় প্রতিদিন প্রায় চার কোটি বার মানুষ এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াত করে। তবে, অবাক করার মতো তথ্য হলো, এই যাতায়াতগুলোর মধ্যে ৭৬ শতাংশই হলো দুই কিলোমিটারের কম দূরত্বের। বিশ্বের অন্যান্য বড় শহরে মানুষ অল্প দূরত্বে হেঁটে চলে এবং তারপর গণপরিবহন ব্যবহার করে। কিন্তু আমাদের এখানে নির্দিষ্ট স্টেশনের অভাবে মানুষ ঘরের দোরগোড়ায় সেবা পাওয়ার জন্য রিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘রিকশা হঠাৎ করে তুলে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে, এগুলোকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে হবে। রিকশার জন্য মানসম্মত নকশা তৈরি করা প্রয়োজন এবং ব্যাটারির মাধ্যমে যে দূষণ হয়, তার দায়ভার উৎপাদনকারীদের নিতে হবে। কোনো যানবাহনই নিবন্ধন ছাড়া সড়কে চলা উচিত নয়। আধুনিক শহর গড়তে হলে নিয়ম-শৃঙ্খলা এবং সঠিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।’
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তা মো. সেলিম খান বলেন, ‘সাধারণত মনে করা হয় ঢাকা শহরে যানজটের প্রধান কারণ রিকশা। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। রাস্তার ফুটপাত অবৈধ দখল হয়ে থাকায় যানজট তৈরি হয়। যদি রাস্তার সবটুকু অংশ যাতায়াতের জন্য ব্যবহার করা যেত, তবে রিকশা কোনো বাধা হতো না। নির্ধারিত পার্কিং ও রুট শৃঙ্খলার অভাবে পরিচালনাগত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। যেখানে অভ্যন্তরীণ বিমান ভ্রমণে প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ১৫ টাকা খরচ হয়, সেখানে ঢাকায় স্বল্প দূরত্বের রিকশা ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২০–৩০ টাকা।’
এএইচ/এমআর