মোস্তফা ইমরুল কায়েস
২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
- আসামিদের অনেকে ফেসবুকে সক্রিয় থাকলেও খুঁজে পাচ্ছে না ডিবি!
- আসামিদের কারো নাম আছে জেলা কমিটিতে
- জড়িতদের অধিকাংশই ছাত্রদলের কর্মী
- ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশ পরিবার
রাজধানীর তেজগাঁও কলেজ ছাত্রাবাসে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হামলায় সাকিবুল হাসান রানা নামে এক শিক্ষার্থী খুনের ঘটনার দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে মূলহোতারা। এ পর্যন্ত পুলিশ মাত্র তিনজনকে গ্রেফতার করেছে। গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পেলেও প্রধান আসামিদের এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করতে না পারায় তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারও বিচার পাওয়া নিয়ে হতাশ।
ঘটনার আগে ও পরে কলেজ হোস্টেলের সিসি ক্যামেরায় কয়েকটি ভিডিও ধারণ হয়। পরে এগুলো যাচাই-বাছাই করে জড়িতদের শনাক্ত করা হলেও তাদের গ্রেফতারের বিষয়ে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। বরং বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের সহপাঠীরা জানিয়েছেন, এই হত্যাকাণ্ডে মাত্র তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও বাকিরা এখনো অধরা। সেজন্য প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। দায়ীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হলে আন্দোলনে নামার কথাও ভেবে দেখছেন তারা।
নিহতের পরিবার ও সহপাঠীরা মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ড সমন্বিতভাবে পরিকল্পিত। হামলায় যারা অংশ নিয়েছে, তারা সক্রিয় ছাত্রদল কর্মী এবং অনেকেই দলের বড় নেতার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় ২৮ জনের বেশি
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের সময় সরাসরি জড়িতসহ ওই সময় উপস্থিত ছিলেন এমন ২৮ জনের নাম পেয়েছে ঢাকা মেইল। তবে কলেজশিক্ষার্থীরা এই সংখ্যাটা ২৮ জনের বেশি বলে দাবি করেন।
তাদের দাবি, বাস্তবে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে আরো অনেকে। এর নেতৃত্ব দিয়েছেন কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোরশেদ আলম তরুণ এবং সদস্য সচিব সেলিম হোসেন। অন্যরা তাদের নানাভাবে সহায়তা করেছেন।
হোস্টেলের কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার সময় সাকিবকে বেদম মারপিট করা হয়। তার মাথায় হাতুড়ি দিয়ে অন্তত ১৫-১৬টি আঘাত করা হয়, যা চিকিৎসকের পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়েছে।
ঢাকা মেইলের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজে অন্তত ২৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। ঘটনার সময়ে সিসি ফুটেজে ছিলেন মেহেদী হাসান। এই মেহেদী কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক তরুণের খুব ঘনিষ্ঠ। মেহেদী হাসানের দুটি ফোন নম্বরের একটি সক্রিয় পাওয়া গেছে। যদিও পুলিশ দাবি করছে তারা সবাই পলাতক ও তাদের ফোন নম্বর বন্ধ। মেহেদী নিয়মিত ফেসবুকে পোস্টও দিচ্ছেন। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ার কাহালু উপজেলায়।
মেহেদী প্রধান আসামি মোরশেদ ইসলাম তরুণের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ। হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি উপস্থিতি ছিলেন, যা সিসিটিভির ফুটেজে এসেছে। মেহেদী এখন কুড়িগ্রামের বড়ভিটা ইউনিয়ন শাখায় নির্বাচনী প্রচারণার কাজে অংশ নিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
হত্যা মামলাটির আরেক আসামি শামসুজ্জামান রবিন। তার গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কলেজের হোস্টেল প্রাঙ্গণে সক্রিয় ছিলেন এবং সরাসরি কিলিং মিশনে অংশ নেন বলে জানা গেছে।
জড়িতদের মধ্যে আরো ছিলেন ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য বাছেদ আলী পিয়াস। তার গ্রামের বাড়ি যশোর জেলায়। তিনি তেজগাঁও কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ঘটনার সময় তার সঙ্গে ছিলেন মেহেদী হাসান। তারা দুজনই একই জেলার বাসিন্দা।
আরও পড়ুন: আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায় যেকোনো দিন
হত্যাকাণ্ডে আরো অংশ নেন মোমেন পাটোয়ারী। তিনি সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন; তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর তিনি ছাত্রদলে যুক্ত হন। এছাড়া মো. হৃদয় আহমেদও হামলায় অংশ নেন। হৃদয় তেজগাঁও কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র।
অন্যরা হলেন- শাহাদাত হোসেন শাকিল, আশিকুর রহমান মতিন, সিহাব হাসান জয়, শেখ সাব্বির রোমান, মাইনুল রনি, অসিম মাহমুদ, মোহাম্মদ আলী, সাখাওয়াত হোসেন সরকার, তৌফিক খান আশিক, নাজমুল হাসান পাপন, মহি উদ্দিন, রানা, সবুজ, নুরুজ্জামান আবির (২০২২-২৩ সেশন), আল নোমান। নোমান তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। মহিবুল্লাহ মণ্ডল সিহাব তেজগাঁও কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক সদস্য। সিহাবুল ইসলাম জয়, আব্দুল হালিম রুবেল ছাত্রদলের কলেজে শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক।
আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় হতাশ নিহতের পরিবার
সাকিব হত্যায় এখন পর্যন্ত বিল্লাল, হৃদয় ও সিয়াম নামে তিনজনকে গ্রেফতার করা হলেও অন্যরা গ্রেফতার না হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের মা। সাকিবের মা খালেদা বেগম ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে ডিবি ও পুলিশ কোনদিনই যোগাযোগ করেনি। হেরা (আসামিরা) খুব শক্তিশালী।’
নিহতের পরিবারের দাবি, রাজনৈতিক চাপের কারণে আসামিদের ধরতে পারছে না ডিবি। এমনকি তারা ধরতে আগ্রহও দেখাচ্ছে না।
যা বলছে পুলিশ
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) সালাউদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত তিনজনকে গ্রেফতার করেছি। বাকিদের গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।’ তবে এখন পর্যন্ত কতজনের সংশ্লিষ্টতা মিলেছে তা বলেননি তিনি।
এসআই সালাউদ্দিনের দাবি, আসামিদের ধরতে তার টিমের সদস্যরা প্রত্যেকের বাড়ি বাড়ি গেলেও তাদের কাউকে পায়নি। এমনকি তাদের ফোন নম্বরগুলোও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে দাবি তার।
এমআইকে/এমআর/এমআই