মো. মেহেদী হাসান হাসিব
১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:০৩ পিএম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা দ্বারা বৈধ ঘোষিত এক হাজার ৮৪২ জনের মধ্যে ১৫৩ জন প্রার্থীর কাছে রয়েছে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। যার মধ্যে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মালিক ১০৩ জন প্রার্থী পেশায় ব্যবসায়ী। অর্থাৎ বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মালিকের ৬৯ শতাংশ প্রার্থীই পেশায় ব্যবসায়ী। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামা পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
এক হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর হলফনামা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১৫৩ জন প্রার্থীর বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যার মধ্যে বিএনপির রয়েছে ৯২ জন, জাতীয় পার্টির ১২ জন, জামায়াতে ইসলামীর ৪ জন, ইসলামী আন্দোলনের ৫ জন, অন্যান্য সব দল মিলে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে ১২ জন প্রার্থীর। আর স্বতন্ত্র ২৮ জন প্রার্থীর রয়েছে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র। এদের মধ্যে পেশায় ব্যবসায়ী ১০৩ জন প্রার্থী, যাদের রয়েছে লাইসেন্স করা আগ্নেয়াস্ত্র।
বিএনপির ছয়জন ও জামায়াতে ইসলামীর একজনের রয়েছে একাধিক অস্ত্র। সর্বোচ্চ পাঁচটি বৈধ অস্ত্র রয়েছে বিএনপির মনোনীত ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তার স্ত্রীর; যার আর্থিক মূল্য ছয় লাখ ৭৬ হাজার। একই দলের কক্সবাজার-১ আসনের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদের কাছে রয়েছে লাইসেন্স করা তিনটি অস্ত্র। কুমিল্লা অঞ্চলের বিএনপির প্রায় সব আসনের প্রার্থীর কাছেই লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে। তাদের মধ্যে কুমিল্লা-১ আসনের প্রার্থী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের আছে একটি রিভলবার ও একটি শটগান। চাঁদপুর-১ আসনের আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও তাঁর স্ত্রীর রয়েছে চারটি অস্ত্র। নরসিংদী-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী ড. আবদুল মঈন খানের রয়েছে দুটি দোনলা বন্দুক। সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও নেত্রকোনা-৪ আসনের প্রার্থী মো. লুৎফুজ্জামান বাবরের রয়েছে তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র।
জামায়াতে ইসলামীর চারজন প্রার্থীর অস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। তারা হলেন টাঙ্গাইল-৬ আসনের এ কে এম আব্দুল হামিদ, ঢাকা-৭ আসনের মো. এনায়াত উল্লা, পিরোজপুর-১ আসনের মাসুদ সাঈদী এবং যশোর-৩ আসনের মো. আব্দুল কাদের। তাদের মধ্যে মো. এনায়াত উল্লার রয়েছে একটি শটগান, একটি রিভলবার ও একটি রাইফেল।
ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ মোজাদ্দেদী, টাঙ্গাইল-৪ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের রুমিন ফারহানা, ভোলা-১ আসনের আন্দালিব রহমান পার্থ এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদেরসহ (জি এম কাদের) আরও কয়েকজন প্রার্থীর লাইসেন্স করা অস্ত্র রয়েছে।
এদিকে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বাচন সামনে রেখে একটি পরিপত্র জারি করেছে। যেখানে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈধ অস্ত্র প্রদর্শন ও বহন করা যাবে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সময় হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করবে। বৈধ অস্ত্র নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বৈঠকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বলেন, সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ পুলিশ গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে ‘ডভিল হান্ট ফেজ-টু’ নামে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে, যার আওতায় চিহ্নিত সন্ত্রাসী, নিয়মিত মামলার আসামি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে সারাদেশে সমন্বিত গ্রেফতার, তল্লাশি ও চেকপোস্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এই অভিযানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার চেকপোস্ট পরিচালিত হচ্ছে এবং বিপুলসংখ্যক যানবাহন তল্লাশির মাধ্যমে অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ উদ্ধার এবং সহস্রাধিক অপরাধী গ্রেফতার করা হয়েছে।
সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরদিন গত ১২ ডিসেম্বর ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদিকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হাদি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাতে মারা যান। হাদিকে গুলি করার ঘটনায় সম্ভাব্য প্রার্থী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। নির্বাচনের আগে প্রার্থী, রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নির্বাচনে তাদের নিরাপত্তার জন্য 'গানম্যান' ও ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলা হয়। নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে। অনেকেই গানম্যান কিংবা ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এসব আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের জন্য গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইসির তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ আসনে মোট ৩ হাজার ৪০৬ জন আগ্রহী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। আর জমা দেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ ৫১টি রাজনৈতিক দলের ১ হাজার ৯০ জন এবং স্বতন্ত্র ৪৭৮ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দেন। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২টি মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়। আর অবৈধ ঘোষণা করা হয় ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র। গত ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল আবেদন গ্রহণ করে নির্বাচন কমিশন। এতে নির্বাচন কমিশনে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৬৪৫টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। এ আপিল আবেদনের মধ্যে ডজনখানেক বৈধ মনোনয়ন বাতিল চেয়েও আবেদন রয়েছে। গতকাল শনিবার (১০ জানুয়ারি প্রথম দিন) নির্বাচন কমিশনে ৭০ জন প্রার্থীর শুনানি হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি আপিল নামঞ্জুর, ৫২টি মঞ্জুর এবং ৩টি পেন্ডিং রয়েছে। আপিল শুনানি চলবে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত।
প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। সেদিনই এবার ভোটে কতজন লড়াইয়ে থাকছে চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণ হবে। রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করবেন ২১ জানুয়ারি। নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি। প্রচার চালানো যাবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। আর ভোট হবে ১২ ফেব্রুয়ারি।
এমএইচএইচ/জেবি