নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০২:৩৮ পিএম
রাজধানী ঢাকায় সকাল থেকে টানা কয়েক ঘণ্টা বৃষ্টি হচ্ছে। এতে নগরীর অনেক সড়ক ও অলিগলিতে পানি জমেছে। অনেক গলিপথ ও মূল সড়ক ডুবে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। জলাবদ্ধতার কারণে কোথাও কোথাও সড়কে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ যানজটের।
রোববার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে রাজধানীর ধানমন্ডি, নিউমার্কেট, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, খিলক্ষেত, মগবাজার ও মালিবাগসহ অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা চোখে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নগর কর্তৃপক্ষ প্রতি বছরই জলাবদ্ধতা নিরসনের আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না। ড্রেনেজব্যবস্থা অকার্যকর থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যায়। তারা বলেন, বৃষ্টি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও জলাবদ্ধতা মানুষের তৈরি সমস্যা। নগর কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে ড্রেনেজব্যবস্থা ঠিক রাখলে এই দুর্ভোগ হতো না।

সকাল থেকে বৃষ্টি থাকায় অনেকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হননি। যারা বেরিয়েছেন তাদের পোহাতে হচ্ছে দুর্ভোগ। বিশেষ করে নিত্যপণ্য কিনতে বের হওয়া মানুষেরা বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। অনেক বাজারেই হাঁটু পানি জমে আছে। ব্যবসা-বাণিজ্যেও দেখা দিয়েছে স্থবিরতা।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে জরুরি ভিত্তিতে পাম্প বসানোসহ নালা-ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। তবে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল সমস্যা হলো পরিকল্পনার ঘাটতি ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের অভাব। প্রতি বছর একই দৃশ্য পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি বেহাল দশা দেখা গেছে নিউমার্কেট এলাকায়। গ্লোব শপিং কমপ্লেক্স থেকে নীলক্ষেত মোড় পর্যন্ত সড়ক ডুবে গেছে। সড়কের মাঝখানে ভাঙা ও ছোট ছোট গর্ত থাকায় রিকশা, প্রাইভেটকারে চলাচলে যাত্রীরা সমস্যায় পড়ছেন। এ এলাকা ছাড়াও ধানমন্ডির মূল সড়কে জলাবদ্ধতায় সড়কে পানি জমে আছে। বিশেষ করে ধানমন্ডি ১৫ থেকে ঝিগাতলার মূল সড়ক এবং ধানমন্ডি ২৭ ও আসাদগেট এলাকায় তীব্র জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। এছাড়াও, মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান, নবোদয়, আদাবর ও মিরপুর ১ নম্বর থেকে চিড়িয়াখানা রোডের বিভিন্ন জায়গায় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে।

নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী রহমান মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, সকাল থেকে বৃষ্টিতে পুরো সড়ক ডুবে দোকানে পানি ঢুকে গেছে। বৃষ্টিতে ভিজে দোকানে এসেছিলাম। ভাবছিলাম বৃষ্টি থামলেই দোকান খুলব। কিন্তু এখন দোকানে এসে দেখি দোকানও ডুবে গেছে। খোলার মতো কোনো অবস্থা নেই।
এদিকে ঝিগাতলা ওয়াইডব্লিউসি স্কুলে সন্তানকে নিয়ে এসেছেন ওয়াদুদ রহমান। তিনি ঢাকা মেইলকে বলেন, সকালে বৃষ্টিতে ভিজে গাড়িতে করে বাচ্চাকে স্কুলে দিয়ে এসেছিলাম। স্কুল ছুটির পর গাড়ি নিয়ে ড্রাইভারকে পাঠিয়েছিলাম তাকে নিয়ে আসতে। ড্রাইভার এসেই ফোন দিয়েছে বৃষ্টির পানিতে সড়ক তলিয়ে গেছে। পানির মধ্যে এ সড়কে গাড়ি চলতে গেলে গাড়িতে পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই রিকশা নিয়েই বাচ্চাকে স্কুল থেকে নিয়ে যাচ্ছি।
একই অভিযোগ করেন স্কুলটির আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক। তাদের অভিযোগ, বৃষ্টি হলেই এই সড়ক পানিতে ডুবে যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতায় আটকে থাকতে হয়। নগরের মেয়র পরিবর্তন হয়, বড় বড় বাজেট হয়, কিন্তু জলাবদ্ধতা আর দূর হয় না।

এদিকে, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে আড়তের চাল ব্যবসায়ীরা বেশি বিপাকে পড়েছেন। অতি বৃষ্টির ফলে চালের আড়তে পানি ঢুকে গেছে। এর আগেও বেশ কয়েক বার পানিতে চাল ভিজে গিয়ে ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
চাল ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়া ঢাকা মেইলকে বলেন, এর আগেও টানা বৃষ্টিতে আমাদের চাল ভিজে গিয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছিলাম। আজকের টানা বৃষ্টিতে অনেকের দোকানে পানি ঢুকে গেছে। আমরা কোনোরকম পানি সেচে দিয়ে কমিয়ে রাখছি। যে রকম টানা বৃষ্টি হচ্ছে এতে মনে হয় না বেশিক্ষণ এভাবে পানি আটকে রাখতে পারব। আমরা দ্রুত এর একটি সমাধান চাই।

অন্যদিকে মিরপুর, কালশী, খিলক্ষেত, কুড়িল ও বাড্ডা এলাকা ঘুরে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় বাসিন্দাদের ভোগান্তির চিত্র চোখে পড়ে। তাদের অভিযোগ, নগরীর খালগুলো ভরাট করায় পানি নিষ্কাশনের রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে। আশপাশে লেক থাকলেও খাল বন্ধ থাকায় অতি বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় নগরবাসী এমন ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রতিনিয়ত।
নগরবাসীর এমন ভোগান্তি কবে শেষ হবে? এমন প্রশ্নের জবাবে নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব ঢাকা মেইলকে বলেন, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, খাল দখল করে নগরায়নের যে মহোৎসব দেখা যাচ্ছে, তা সংশ্লিষ্টদের ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত নগরবাসী এই জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পাবে না। প্রতিটি এলাকায় ড্রেনেজব্যবস্থা এবং খালগুলো উদ্ধার করে তা দিয়ে পানি চলাচল নিশ্চিত করতে পারলেই নগরীর এই সমস্যার সমাধান হবে।
একেএস/জেবি