ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৯ জুন ২০২৬, ০২:৩৮ পিএম
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে অধিকাংশ শিক্ষার্থীর মতো আমিও মনে করতাম, বড় ক্যারিয়ার গড়তে হলে বড় প্রতিষ্ঠানের ইন্টার্নশিপ, চমকপ্রদ সার্টিফিকেট কিংবা উচ্চ পারিশ্রমিকের কোনো সুযোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝতে পারি, আমার পেশাজীবনের সবচেয়ে মূল্যবান শিক্ষাগুলো এসেছিল ঘণ্টায় মাত্র ৯০ টাকা পারিশ্রমিকের একটি স্টুডেন্ট ওয়ার্কার চাকরি থেকে।
২০২২ সালের কথা। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে ১০০% স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করছিলাম। এক সেমিস্টারের অ্যাডভাইজিংয়ের পর হঠাৎ দেখি আমার নেওয়া কোর্সগুলো সিস্টেম থেকে উধাও হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র নিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইটি ডিপার্টমেন্টে যোগাযোগ করি। সেই সময় আমার সঙ্গে কথা বলার পর আইটি নেটওয়ার্ক ম্যানেজার রাশেদ মজুমদার স্যার আমাকে স্টুডেন্ট ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন।
মজার বিষয় হলো, আমি প্রথমে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলাম। তখন আমি কয়েকটি টিউশনি করাতাম এবং তুলনামূলকভাবে ভালো আয়ও করতাম। তাই ঘণ্টায় ৯০ টাকার চাকরিকে আমার কাছে খুব একটা আকর্ষণীয় মনে হয়নি। কিন্তু কিছুদিন পর উপলব্ধি করলাম, সাময়িক আয়ের চেয়ে বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি মূল্যবান। প্রায় এক মাস ভেবে আমি আবার আইটি ডিপার্টমেন্টে ফিরে যাই এবং কাজ শুরু করি। পরে বুঝেছি, সেটিই ছিল আমার জীবনের অন্যতম সেরা সিদ্ধান্ত।
আরও পড়ুন
হুট করে চাকরি চলে গেলে কী করবেন?
আইটি ডিপার্টমেন্টে আমাদের দায়িত্ব ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে আসা বিভিন্ন কল রিসিভ করা, সমস্যার ধরন বুঝে সংশ্লিষ্ট বিভাগে ফরওয়ার্ড করা এবং ব্যবহারকারীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া। কাজটি শুনতে সাধারণ মনে হলেও এখান থেকেই আমি শিখেছিলাম দায়িত্ববোধ, সময়ানুবর্তিতা, দলগত কাজ এবং পেশাগত যোগাযোগের মৌলিক বিষয়গুলো।
শুরুতে আমি ছিলাম খুবই সরল এবং অনভিজ্ঞ। অফিসে কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে সমস্যা উপস্থাপন করতে হয় কিংবা কীভাবে পেশাদার পরিবেশে নিজেকে পরিচালনা করতে হয়—এসবই ধীরে ধীরে শিখেছি সহকর্মী ও সিনিয়রদের কাছ থেকে। বিশেষ করে আমার ট্রেইনার তাজরিণ রহমান এবং অন্যান্য সহকর্মীরা কাজ শেখানোর পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং দলগত সমন্বয়ের গুরুত্বও বুঝিয়েছেন।
স্টুডেন্ট ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল সততা এবং জবাবদিহিতা। শিফট পরিবর্তন, দায়িত্ব ভাগাভাগি কিংবা কাজের হিসাব—সব ক্ষেত্রেই নির্ভুলতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করতাম। ছোট ছোট এসব অভ্যাসই পরবর্তীতে আমার পেশাগত জীবনের ভিত্তি গড়ে দেয়।
আইটি ডিপার্টমেন্টে কাজ করতে গিয়ে শুধু প্রযুক্তিগত বিষয়ই শিখিনি; শিখেছি মানুষের সঙ্গে কাজ করা, চাপের মধ্যে শান্ত থাকা, সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা এবং প্রতিদিন নতুন কিছু শেখার মানসিকতা গড়ে তোলা। বিভিন্ন বিভাগ, কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করার ফলে যোগাযোগ দক্ষতা ও বাস্তব কর্মপরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করি।
সাড়ে তিন বছরের সেই যাত্রায় আমি অনেক অসাধারণ মানুষের সংস্পর্শে এসেছি। তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কোনো না কোনো শিক্ষা পেয়েছি। কেউ শিখিয়েছেন শৃঙ্খলা, কেউ ধৈর্য, কেউ দায়িত্ববোধ, আবার কেউ শিখিয়েছেন মানুষের সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আজও তাঁদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
বর্তমানে করপোরেট জীবনে কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই উপলব্ধি করি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই আইটি ডিপার্টমেন্টই আমাকে বাস্তব কর্মজীবনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতি দিয়েছিল। সেখানে শেখা সময় ব্যবস্থাপনা, পেশাগত যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং দায়িত্বশীলতার শিক্ষা আজও প্রতিদিন কাজে লাগে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার একটি পরামর্শ থাকবে—শুরুতেই শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের নাম বা উচ্চ পারিশ্রমিকের পেছনে ছুটবেন না। এমন সুযোগ খুঁজুন যেখানে বাস্তব কাজ শেখা যায়, দায়িত্ব নেওয়া যায় এবং নিজের দক্ষতা গড়ে তোলা যায়। কারণ ক্যারিয়ার কোনো ১০০ মিটারের স্প্রিন্ট নয়; এটি একটি দীর্ঘ ম্যারাথন। অনেক সময় ঘণ্টায় ৯০ টাকার একটি চাকরিই ভবিষ্যতের সবচেয়ে মূল্যবান বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।
লেখক: ইউএস-বাংলা অ্যাসেটস লিমিটেডে কর্মরত; নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক স্টুডেন্ট ওয়ার্কার (২০২২–২০২৫) এবং অর্থনীতি বিভাগের সাবেক টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট