images

লাইফস্টাইল

শহুরে একাকীত্ব: ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দি মানুষের জীবন

লাইফস্টাইল ডেস্ক

২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৩৩ পিএম

শহর কখনো ঘুমায় না— এই কথার ভেতর লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর সত্য। আমরা মানি বা না মানি এটাই সত্য যে শহর জাগে ঠিকই, কিন্তু এর মানুষগুলো ধীরে ধীরে নিভে যায়। চারদিকে আলো, শব্দ, লিফটের ওঠানামা, গাড়ির হর্ন, মোবাইলের নোটিফিকেশন— সবকিছুর ভিড়ে মানুষ একা হয়ে পড়ে সবচেয়ে নিঃশব্দভাবে। জীবনটা এখানে যান্ত্রিক। একাকীত্ব ঘিরে ধরে মানুষকে। এই একাকীত্ব কোনো নাটকীয় কান্না নয়, বরং নীরব, ধীর, প্রতিদিনের।

ফ্ল্যাটবাড়ির জানালাগুলো সারিবদ্ধ। ঠিক যেন কাগজে আঁকা ছবির মতো। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়— এখানে কত জীবন, কত গল্প! কিন্তু প্রতিটি জানালার ভেতর আলাদা দ্বীপ। এই দ্বীপে যেন কারো প্রবেশ নেই, কেউ কাউকে চেনে না, জানে না, জানতেও চায় না।

পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকে তা হয়তো জানা আছে। কিন্তু সে কেমন আছে— সেটা জানার প্রয়োজন নেই। কখনো বা কে থাকে সেটাও জানা হয় না। কারণ শহরে ‘ভালো থাকা’ এখন ব্যক্তিগত, সামাজিক নয়। শহরে যেন মাথায় টোকা লাগলেও কেউ কাউকে চেনে না। একই বিল্ডিং এ হাজার মানুষ থাকলেও কেউ কাউকে জানি না।

city

এক সময় শহরেও উঠোন ছিল। সন্ধ্যায় চায়ের কাপে গল্প, বিকেলে বাচ্চাদের খেলাধুলা, রাতে মুরুব্বিদের আড্ডা। এখন উঠোন নেই— আছে বারান্দা। কিন্তু সেই বারান্দায় কেউ বসে না। কারণ সামনে তাকালে আরেকটা বারান্দা, আরেকটা নিঃসঙ্গ মানুষ। দুজনেই মুখ ফিরিয়ে নেয়— ভয় পায়, যদি চোখাচোখি হয়ে যায়! ফ্ল্যাটবাড়ির মানুষগুলো সময়ের অভাবে নয়, অনুভূতির অভাবে কথা বলে না।

সবাই ব্যস্ত, সবাই ক্লান্ত। সকালে বেরোয়, রাতে ফেরে। মাঝখানে জীবনের কী হলো— সেটা কেউ জানে না। কেউ অসুস্থ হলে দরজায় নোটিশ: “ডিস্টার্ব করবেন না”। কেউ মারা গেলে লিফট নেমে যায় চুপচাপ, শোকযাত্রা ছাড়াই। শহুরে একাকীত্বের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক— এটা চোখে পড়ে না। আবার কেউবা দেখেও দেখে না। কেউ আবার দেখতে আসলেও অপরপক্ষ ভালোভাবে নেয় না। 

কেউ হাসে, ছবি তোলে, স্টোরি দেয়। কিন্তু রাতে ঘরে ফিরে নিজেকে প্রশ্ন করে— “আমি কার কাছে জরুরি?” এই প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে অনেকে অভ্যস্ত হয়ে যায়। একা থাকার সঙ্গে আপস করে। কেউ বই পড়ে, কেউ স্ক্রিনে ডুবে, কেউ নিজেকে ব্যস্ত রাখে—যেন অনুভব করার সময় না থাকে।

kid

শিশুরা বাড়ছে চার দেয়ালের মধ্যে। তাদের খেলাঘর স্ক্রিনে, বন্ধু ভার্চুয়াল।স্কুলগুলো যেন খেলার মাঠবিহীন।এই বাচ্চারা দৌড়াতে জানে না,এই বাচ্চারা বোঝে না প্রকৃতি।তাদের সবকিছু স্ক্রিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

বৃদ্ধরা জানালার পাশে বসে গাড়ির শব্দ গুনে সময় কাটায়। সমবয়সীদের সাথে করা হয় না তাদের। তারা যেন এই সমাজের সব থেকে বেশি অবহেলিত। 

মধ্যবয়সীরা সবচেয়ে বেশি হারায়। দায়িত্ব আর ক্লান্তির মাঝে নিজের অস্তিত্ব ভুলে যায়। এই শহরে কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না, যদি না কাজ থাকে। সম্পর্কগুলো 'ইউজ অ্যান্ড ডিসকার্ড'।

city_1

ফ্ল্যাটবাড়ির দেয়াল শুধু ইট-সিমেন্টের নয়— অনুভূতির দেয়াল। এই চার দেয়াল জানে মানুষের ভেতরের যন্ত্রণা। এই চার দেয়ালের মাঝেই সীমাবদ্ধ মানুষের হাসি-কান্না। 

তবু শহর পুরোপুরি দোষী নয়। আমরাই নিরাপত্তার নামে দূরত্ব বেছে নিয়েছি। অচেনাকে ভয় পেয়েছি, পরিচিতকেও এড়িয়েছি। একটু সময়, মনোযোগ, মানবিকতা—এই তিনটার অভাবেই শহর এত একা।

আরও পড়ুন- 
 
 
 

হয়তো সমাধান ছোট। পাশের ফ্ল্যাটে এক কাপ চা নিয়ে কড়া নাড়া। লিফটে একটা হাসি। ছাদে দুই মিনিট কথা।

এই ছোট যোগাযোগ শহরের দেয়ালে ফাটল ধরাতে পারে। কারণ মানুষ একা থাকতে চায় না। মানুষকে দরকার শুধু একজনকে, যে জিজ্ঞেস করবে, “কেমন আছ?”। তখন শহর আর নীরব লাগবে না। ফ্ল্যাটবাড়ি বন্দিশালা নয়, হবে মানুষে ভরা জীবন্ত সমাজ।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শিল্পপুরাণ

এনএম