Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

রাজনৈতিক বয়ানে ‘অনুমাননির্ভর রায়’ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল: ইনুর আইনজীবী

নিজস্ব প্রতিবেদক

১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:২৩ পিএম

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে দেশে সংঘটিত ঘটনাবলির প্রকৃত চিত্র অনুধাবন না করে কেবল প্রসিকিউশনের রাজনৈতিক বয়ানের ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ‘অনুমাননির্ভর রায়’ দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ।

জুলাই আন্দোলন ঘিরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের কারাদণ্ডের রায় বাতিল এবং সব অভিযোগ থেকে সাবেক তথ্যমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ খালাস চেয়ে বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল আবেদন জমা দেওয়া হয়।

সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আবেদনটি জমা দেওয়ার পর অ্যানেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাবেক বিচারপতি মনসুরুল হক চৌধুরীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন ১৯৭৩-এর ২১(১) ধারা অনুযায়ী আপিল বিভাগে আবেদনটি করা হয়েছে। এটি ‘ক্রিমিনাল আপিল নম্বর ৬৩/২০২৬’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ বলেন, ‘সর্বোপরি ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশে গত ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনা সমূহের প্রকৃত চিত্র অনুধাবন না করেই শুধুমাত্র প্রসিকিউশনের রাজনৈতিক বয়ানের ওপর ভিত্তি করে একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় অনুমাননির্ভর রায় প্রদান করেছেন। এই সাজা বাতিল ও তার পূর্ণ খালাস চেয়ে আমরা গতকাল আপিল বিভাগে আবেদন করেছি।’

তিনি জানান, এই আপিলে ট্রাইব্যুনালের রায় ও প্রসিকিউশনের অভিযোগ খণ্ডন করে ২৩টির বেশি আইনি যুক্তি বা গ্রাউন্ড তুলে ধরা হয়েছে।

‘ফোনালাপ ও বক্তব্য কোনো অপরাধের মধ্যেই পড়ে না’

আপিলের মূল যুক্তিগুলো ব্যাখ্যা করে আইনজীবী শুভ বলেন, ‘প্রথমত, আসামির বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধের যেসব অভিযোগ এনেছে, তার সপক্ষে কোনো চাক্ষুষ সাক্ষ্যপ্রমাণ বা সুনির্দিষ্ট তথ্যউপাত্ত তারা হাজির করতে পারেনি। সাক্ষ্যপ্রমাণের ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কেবল পারিপার্শ্বিকতার অজুহাতে তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে।

‘দ্বিতীয়ত, ইনুর যেসব কর্মকাণ্ডকে প্রসিকিউশন মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে সাজিয়েছে- যেমন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথোপকথন, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথিত ফোনালাপ, ১৪ দলের বৈঠকে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকার- সেগুলো প্রচলিত আইনে কোনো ফৌজদারি অপরাধের মধ্যেই পড়ে না, মানবতাবিরোধী অপরাধ তো অনেক দূরের বিষয়। অথচ এই সাধারণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্যই তাকে সাজা দেওয়া হয়েছে,’ জানান এই আইনজীবী। 

তদন্তের দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে জেরা করার সময় তদন্তের গুরুতর ঘাটতি ও সীমাবদ্ধতার যে চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, ট্রাইব্যুনাল নিজেও রায়ে তা উল্লেখ করেছেন। আদালত বিষয়টি চিহ্নিত করার পরও একটি ত্রুটিপূর্ণ, আংশিক, একপেশে ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্তের ভিত্তিতে আনীত অভিযোগে ইনুকে দণ্ড দেওয়া হয়েছে।’

গত ৩০ জুন বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলার রায়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড ও দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন। ৫০০ পৃষ্ঠার সেই পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয় গত ২০ সেপ্টেম্বর।

আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী, রায়ের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করার বিধান রয়েছে এবং ২১(৪) ধারায় আপিল দায়েরের পর ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির কথা বলা আছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর আসামিপক্ষ রায়ের সার্টিফাইড কপি হাতে পাওয়ার পর আপিলের চূড়ান্ত এই পদক্ষেপ নিল।

মৃত্যুদণ্ড চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল

এর আগে গত ৫ অক্টোবর ইনুর ১০ বছরের কারাদণ্ড বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। সেদিন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম জানিয়েছিলেন, ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজাকে ‘অপর্যাপ্ত মনে করায়’ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ১১টি যুক্তি বা গ্রাউন্ড তুলে ধরে আপিলটি করা হয়েছে। আপিলটি গ্রহণ করে ইনুকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে।

ইনুর খালাস পাওয়া কয়েকটি অভিযোগেও সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হয়েছে জানিয়ে তামীম বলেছিলেন, ‘শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জুরিসপ্রুডেন্স অনুযায়ী অপরাধের ভয়াবহতা, গভীরতা এবং ‘স্কেল অব দ্য অ্যাটাক’ বিবেচনা করতে হয়। কত মানুষের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন এবং এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে সমাজের প্রত্যাশা কী- এসব বিষয়ও আপিলে তুলে ধরা হয়েছে।’

প্রসিকিউশনের ভাষ্য, ট্রাইব্যুনাল ইনুর বিরুদ্ধে দেওয়া পর্যবেক্ষণে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার কথোপকথন, আন্দোলন দমনে পরামর্শ, কারফিউ জারি এবং আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তারের পরামর্শ দেওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরেছে। এসব কর্মকাণ্ডকে সত্য বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়ার পরও ইনুকে ১০ বছরের সাজা দেওয়ার বিষয়টি ওই পর্যবেক্ষণের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’।

কী ছিল প্রমাণিত তিন অভিযোগে

মামলার একমাত্র আসামি ইনুর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনের সময় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখকে হত্যাসহ উসকানি, ষড়যন্ত্র, প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার ও নিপীড়নমূলক কৌশলে সমর্থনের অভিযোগে মোট আটটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

এর মধ্যে তৃতীয়, ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে তাকে বাকি পাঁচটি অভিযোগ থেকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল।

তৃতীয় অভিযোগ: ২০২৪ সালের ২০ জুলাই দুপুরে কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ভিডিও দেখে শনাক্ত করে দমন, আটক, নির্যাতন ও হত্যার নির্দেশ দেন ইনু।

আরও পড়ুন:

ষষ্ঠ অভিযোগ: আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নিতে ২৯ জুলাই ১৪ দলীয় জোটের সভায় উপস্থিত থেকে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত, সন্ত্রাসী, সাম্প্রদায়িক’ ট্যাগ দেন তিনি। একই সভায় জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

সপ্তম অভিযোগ: ৪ আগস্ট বিকেলে আন্দোলনকারীদের ‘জঙ্গি’ তকমা দিয়ে কারফিউ জারির মাধ্যমে গুলি চালানোর কঠোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে অধস্তনদের নির্দেশ দেন ইনু।

ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২৬ অগাস্ট রাজধানীর উত্তরা থেকে হাসানুল হক ইনুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর থেকেই তিনি কারাগারে রয়েছেন।

‘বিদেশি আইনজীবী নিয়োগে বাধা নেই’

এদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টিও বিস্তারিত তুলে ধরেন আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ। তিনি বলেন, ‘বার কাউন্সিলের বিধি বিদেশি আইনজীবী অনুমোদন করে না- এমন বক্তব্য সঠিক নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের সংশোধিত ১১(৮) ধারায় স্পষ্ট বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালের বার কাউন্সিল অর্ডারে যাই থাকুক না কেন, বার কাউন্সিলের অনুমতি সাপেক্ষে ট্রাইব্যুনাল বিদেশি আইনজীবীকে আসামিপক্ষে শুনানির সুযোগ দিতে পারেন।’

এ পর্যন্ত তিনজন আসামি বিদেশি আইনজীবীর প্রতিনিধিত্ব চেয়ে আবেদন করেছেন। তারা হলেন- সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান এবং সাংবাদিক ফারজানা রূপা।

আইনজীবী শুভ বলেন, ‘সাংবাদিক ফারজানা রূপার পক্ষে শুনানির জন্য ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্যের দুজন আইনজীবী বার কাউন্সিলে ইমেইল করেছেন। বার কাউন্সিল এখনও সিদ্ধান্ত না জানানোয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব শফিক লিখিত আবেদন জমা দিয়েছেন, যাতে এই দুই ব্রিটিশ আইনজীবীকে মামলা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘আইন যখন এই সুযোগ বা অধিকার নিশ্চিত করেছে, তখন বার কাউন্সিলের উচিত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন দেশের প্রচলিত সাধারণ ফৌজদারি আইন থেকে আলাদা। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এ ধরনের আন্তর্জাতিক আইনে কাজ করার যাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তারা শুনানিতে যুক্ত হলে দেশীয় আইনজীবীরা সমৃদ্ধ হবেন এবং সামগ্রিক বিচারপ্রক্রিয়া আরও গ্রহণযোগ্য ও সমৃদ্ধ হবে।’

আরএনবি/এসআই