চাকরিতে প্রবেশের সময় কোনও কর্মকর্তা বা কর্মচারীর যে অধিকার ও পদোন্নতির যোগ্যতা থাকে, পরবর্তীতে বিধি বা প্রবিধানমালা সংশোধন করে তা কেড়ে নেওয়া যাবে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
রায়ে আদালত বলেছেন, যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাকরির প্রবিধানমালা সংশোধন করার পূর্ণ ক্ষমতা কর্তৃপক্ষের রয়েছে। তবে কোনোভাবেই তা ভূতাপেক্ষভাবে (পেছনের সময় থেকে) কার্যকর দেখিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগে অর্জিত আইনি সুবিধা বা অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে কর্মরত সাতজনের পদোন্নতি-সংক্রান্ত বিরোধ নিয়ে করা এক রিট আবেদন নিষ্পত্তি করে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিমের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।
গত ১৯ আগস্ট দেওয়া ১৭ পৃষ্ঠার ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। ‘মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদার ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র’ মামলায় আদালতের মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি এ এফ এম সাইফুল করিম।
আদালতে রিট আবেদনকারীদের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহফুজ বিন ইউসুফ ও আক্তার হোসেন মো. আবদুল ওহাব।
মামলার পটভূমি
মামলার নথি ও রায় পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মোহাম্মদ কামরুজ্জামান তালুকদারসহ মোট সাতজন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে (বারি) যোগদান করেন। পরবর্তীতে তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়।
তৎকালীন ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’ অনুযায়ী ফিডার পদে পাঁচ বছর চাকরি সম্পন্ন করার পর উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) থেকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে শতভাগ পদোন্নতির বিধান ছিল। রিট আবেদনকারী সাত প্রকৌশলীই ২০২১ সালের আগেই প্রবিধানমালা অনুযায়ী পদোন্নতির নির্ধারিত পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অর্জন করেন।
আরও পড়ুন:
তবে ২০২১ সালের ৯ মার্চ সরকার ‘বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রবিধানমালা, ২০২১’ গেজেট আকারে প্রকাশ করে। নতুন এই প্রবিধানমালার ৩২ নম্বর ক্রমিকে সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদটি শতভাগ পদোন্নতির পরিবর্তে ৩৩ শতাংশ পদোন্নতি এবং ৬৭ শতাংশ সরাসরি নিয়োগের মাধ্যমে পূরণের বিধান করা হয়। অন্যদিকে ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের পদোন্নতির শতভাগ কোটা অপরিবর্তিত রাখা হয়।
নতুন এই প্রবিধানমালার ফলে পদোন্নতির অর্জিত অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে রিট আবেদনকারীরা ২০২১ সালে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। প্রাথমিক শুনানি শেষে আদালত রুল জারি করেছিলেন।
আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক
শুনানিতে রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী এস আর এম লুৎফর রহমান আখন্দ বলেন, ২০২১ সালের সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগেই তার মক্কেলরা পদোন্নতির সব শর্ত পূরণ করে অধিকার অর্জন করেছিলেন। তাই পরবর্তী সংশোধনের মাধ্যমে তাদের প্রতিকূলে পদোন্নতির সুযোগ সংকুচিত করা বেআইনি ও বৈষম্যমূলক।
অন্যদিকে বারির আইনজীবী কবির ইকবাল হোসেন যুক্তি দেন, ২০১১ সালের প্রবিধানমালা রহিত করে ২০২১ সালের প্রবিধানমালা প্রবর্তন করা হয়েছে। ফলে রহিত প্রবিধানের অধীনে কেউ পদোন্নতি দাবি করতে পারেন না। এ ছাড়া সেবার মান বাড়াতে সিভিল শাখায় বিএসসি প্রকৌশলীদের সরাসরি নিয়োগের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা
উভয় পক্ষের শুনানি ও নথি পর্যালোচনা করে রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলে, প্রবিধান সংশোধনের আগেই যারা পদোন্নতির জন্য যোগ্য হয়েছিলেন, সেই রিট আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে নবপ্রণীত ২০২১ সালের পদোন্নতি প্রবিধান ভূতাপেক্ষভাবে প্রয়োগ করা যাবে না। রিট আবেদনকারীরা পূর্ববর্তী ২০১১ সালের প্রবিধানের অধীনে অর্জিত ও প্রতিষ্ঠিত অধিকারের অধিকারী। পরবর্তীকালে প্রবিধানে কোনো পরিবর্তন এনে তাদের এই অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।
আদালত আরও পর্যবেক্ষণ দেন, সংশোধিত প্রবিধানমালা কার্যকর হওয়ার আগে যেসব আবেদনকারী পদোন্নতির নির্ধারিত চাকরিকাল, যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত পূরণ করেছিলেন, তাদের পদোন্নতির বিষয়টি আগের ২০১১ সালের প্রবিধান অনুযায়ী কঠোরভাবে বিবেচনা করতে হবে। পরবর্তীতে চালু করা কোনো নতুন শর্তের কারণে তাদের অর্জিত যোগ্যতা ক্ষুণ্ন করা যাবে না।
সারবত্তা থাকায় রিটটির রুল নির্দেশনাসহ নিষ্পত্তি করেন আদালত।
নির্দেশনায় বলা হয়, ২০২১ সালের প্রবিধানমালা চালুর আগেই পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জনকারী রিট আবেদনকারীদের ‘বারি প্রবিধানমালা, ২০১১’-এর সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) পদে পদোন্নতির বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। পদের শূন্যতা, যোগ্যতা এবং পদোন্নতি সংক্রান্ত অন্যান্য আইনানুগ শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগামী এক মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিধানের অধীনে এই পদোন্নতি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বিবাদীদের নির্দেশ দেওয়া হলো।
একই সঙ্গে রায়ের আলোকে পূর্বে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনার আদেশটিও নিষ্পত্তি করে রায় ও আদেশ অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার নির্দেশ দেন আদালত।
আরএনবি/এসআই




