নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০১:১১ পিএম
দেশে কনসার্ট, নাট্য প্রদর্শনী, বাউল গান ও ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচসহ সব ধরনের শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন রক্ষা এবং ঢাকায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি সংরক্ষণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সংশ্লিষ্টদের নিরাপত্তায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) প্রণয়ন এবং হুমকি-ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার আর্জি জানানো হয়েছে এতে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি জনস্বার্থে এবং নিজস্ব সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় ব্যক্তিগতভাবে (ইন পারসন) এ আবেদনটি করেন।
রিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব, আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) বিবাদী করা হয়েছে।
‘দেশকে আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না’
রিট দায়েরের পর আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি বলেন, 'বর্তমানে পুরো দেশব্যাপী আমাদের সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পের ওপর এক ধরনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণ চলছে। সম্প্রতি দেখলাম ঢাকার রাস্তার পাশের একটি দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতির মুখ মুছে ফেলার অপচেষ্টা হয়েছে। দেশে একদল মৌলবাদী শক্তি সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যারা দেশকে একটা আফগানিস্তান বানানোর পেছনে লেগে গেছে।'
তিনি বলেন, 'ছোটবেলায় রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে যে প্রজন্ম বড় হয়েছে, তাদেরই একটি অংশ এসে আজ রবীন্দ্রনাথকে মুছে ফেলতে চাইছে। পুরো দেশজুড়ে কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকর্মী ও সংগীতশিল্পীদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড এখন বাধার মুখে।'
সাংস্কৃতিক আয়োজনে বাধাদানের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট, বাউল গান বা লোকজ উৎসবের আয়োজন হলেই ‘তৌহিদী জনতা’র নাম দিয়ে একটি গোষ্ঠী এসে বাধা দিচ্ছে, হামলা ও ভাঙচুর চালাচ্ছে। এতে দেশের সুস্থ সাংস্কৃতিক বিকাশ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
'ধর্ম ধর্মের জায়গায় থাকবে; ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে সংস্কৃতিকে নষ্ট করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা ধর্মের স্পষ্ট অপব্যবহার' যোগ করেন আইনজীবী অভি।
আইনজীবী অভি আরও বলেন, আমরা তো এই দেশকে আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। এটা লালনের বাংলাদেশ, রবীন্দ্রনাথের বাংলাদেশ, নজরুলের বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে কোনোভাবেই শিল্প-সাহিত্যকে ধ্বংস হতে দেওয়া যাবে না।
সংবিধানের ২৩ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট করে বলা আছে, জনগণের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার সংরক্ষণ এবং জাতীয় ভাষা, সাহিত্য ও শিল্পকলার বিকাশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি জানান, আমরা আদালতের কাছে নির্দেশনা চেয়েছি যাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেয় এবং কনসার্ট, নাটক, সিনেমা, গান ও রবীন্দ্র প্রতিকৃতির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
রিট আবেদনটি খুব দ্রুত নিয়মিত একটি হাইকোর্ট বেঞ্চে এর ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান আইনজীবী সাদ্দাম হোসেন অভি।
সাম্প্রতিক যেসব ঘটনার উল্লেখ
রিট আবেদনে বলা হয়েছে, আইনসম্মত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বেসরকারি ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অযাচিত চাপ ও বাধার কারণে অনুষ্ঠান বাতিল বা স্থগিতের একটি প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
আবেদনে প্রেক্ষাপট হিসেবে চলতি ২০২৬ সালের বেশ কয়েকটি ঘটনার তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে মে মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্থানীয় বিরোধিতার মুখে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী স্থগিতের ঘটনা রয়েছে।
এছাড়া ২৫ জুন ঢাকায় ভারতীয় শিল্পী অনুপম রায়ের কনসার্ট ‘অনিবার্য পরিস্থিতি ও সরকারি নির্দেশনা’র কারণে স্থগিত করতে বাধ্য হন আয়োজকরা। ১৮ আগস্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইন্সে একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গান বাজানো নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষ ঘটে, এতে কয়েকজন আহত হন।
পরদিন ১৯ আগস্ট কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে ধর্মীয় আপত্তি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে ব্যান্ড ‘অ্যাশেজ’ ও সংগীতশিল্পী নোবেলের নির্ধারিত কনসার্ট বাতিল করা হয়।
একইভাবে আগস্ট মাসে সিলেটের বিয়ানীবাজারে সোনাই নদীতে এবং ১৮ সেপ্টেম্বর গোলাপগঞ্জে কুশিয়ারা নদীতে ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ আয়োজনের বিরুদ্ধে ‘তৌহিদী জনতা’ পরিচয়ে আপত্তি ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে পালাগান, বাউল গান, নাটক ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে বাধা এবং ঢাকার দেয়ালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অপচেষ্টার তথ্যও আবেদনে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
সংবিধান ও আইনের যুক্তি
রিটে বলা হয়, এই আবেদনে আবেদনকারীর কোনো ব্যক্তিগত বাণিজ্যিক স্বার্থ নেই; এটি নাগরিক, শিল্পী, সংগঠক ও দর্শকদের সুরক্ষার প্রশ্ন।
আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, জনশৃঙ্খলা বা শালীনতার স্বার্থে কর্তৃপক্ষ বৈধভাবে অনুষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে কোনো ব্যক্তি বা বেসরকারি গোষ্ঠীর আইনসম্মত অনুষ্ঠান বন্ধ করার আইনি অধিকার বা ‘ভেটো ক্ষমতা’ নেই। মতপার্থক্য থাকলে তা নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রকাশ করা যায়; কিন্তু বলপ্রয়োগ বা হুমকির মুখে অনুষ্ঠান বন্ধ করা সম্পূর্ণ বেআইনি।
এতে বলা হয়, হুমকি এলে রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো ‘প্রতিরোধমূলক পুলিশিং’ ও নিরাপত্তা দেওয়া; চাপের মুখে নতি স্বীকার করে অনুষ্ঠান বন্ধ করা নয়। একটি সুনির্দিষ্ট এসওপি না থাকায় শিল্পী ও আয়োজকরা বারবার অনিশ্চয়তা ও অসঙ্গতিপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মুখে পড়ছেন।
এসব ঘটনায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৩ (সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ), ২৭ (আইনের দৃষ্টিতে সমতা), ৩১ (আইনের আশ্রয়লাভের অধিকার), ৩২ (জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা), ৩৭ (সমাবেশের স্বাধীনতা) এবং ৩৯ (চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতা) চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়।
আবেদনে বলা হয়, এসব বিষয়ে নিরাপত্তা ও এসওপি প্রণয়নের অনুরোধ জানিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিবাদীদের আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় রিটটি করা হয়েছে।
যা চাওয়া হয়েছে রিট আবেদনে
রিটে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তাকে কেন ‘আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও কার্যকারিতাহীন’ ঘোষণা করা হবে না—তা জানতে চেয়ে রুল জারির আর্জি জানানো হয়েছে।
পাশাপাশি রুল শুনানিকালীন অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনায় দেশের যে কোনো প্রান্তে কনসার্ট, নাট্য প্রদর্শনী, বাউল গান, ঐতিহ্যবাহী নৌকা বাইচ, পহেলা বৈশাখ উদযাপনসহ সব শান্তিপূর্ণ সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং এতে অংশ নেওয়া শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা দেওয়ার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
আরএনবি/এআরএম