নিজস্ব প্রতিবেদক
০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৫ পিএম
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় কারাবন্দি মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানকে অন্য বন্দিদের সঙ্গে না এনে একা প্রিজন ভ্যানে আদালতে হাজির করার পেছনে ‘গভীর ষড়যন্ত্র’ দেখছেন তার বোন ও আইনজীবী নাজনীন নাহার। তাকে ‘বলির পাঁঠা’ বানানো হচ্ছে দাবি করে ট্রাইব্যুনালে বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ এবং সরকারি দফতরে ৫২টি বিষয়ের নথি চেয়ে আবেদনও করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবারর (৮ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনজীবী নাজনীন নাহার তাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর এমন অভিযোগ করেন।
এর আগে গত ৬ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ এই আবেদনগুলোর ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। ওইদিন জিয়াউল আহসানকেও ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল।
অন্য বন্দিদের সঙ্গে না এনে তাকে একা ট্রাইব্যুনালে আনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কেরানীগঞ্জ থেকে আজকে আটজন বন্দি এসেছে। এর মধ্যে সাতজনকে এক গাড়িতে নিয়ে আসা হয় এবং জিয়াউল আহসানকে শুধু একা একটি গাড়িতে আনা হয়েছে। তাকে এভাবে একা নিয়ে আসাকে আমি গভীর ষড়যন্ত্র মনে করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাকে যেন অন্যান্য বন্দিদের সঙ্গেই আনা হয়, সেই আবেদন আমি আদালতের কাছে করেছি। আদালত বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
আরও পড়ুন
‘অক্টোবরেই শেষ হতে পারে জিয়াউলের গুম-খুনের মামলার বিচার’
আবরার হত্যা: আপিল শুনানি না হওয়ায় হতাশ পরিবার, রাষ্ট্রপক্ষের আশ্বাস
এদিকে মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক র্যাব কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদকে নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন তার আইনজীবী। সেই অভিযোগে জিয়াউল আহসানের নাম আসার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে নাজনীন বলেন, ‘উনি আছেন কেরানীগঞ্জ কারাগারে, আর তারেক সাঈদ সম্ভবত মুন্সীগঞ্জ কারাগারে ছিলেন। রাতে কি তাকে কেরানীগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ যাওয়ার জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল? এর কোনো ব্যাখ্যা নেই।’
উল্লেখ্য, সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ লক্ষ্মীপুর ও কুমিল্লায় পাঁচ বিএনপি নেতাকে খুন ও গুমের অভিযোগে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (২) দায়ের করা দুই মামলার আসামি।
আইনজীবী নাজনিন নাহার দাবি করেন, বাংলাদেশে কখনো কখনো কোনো আন্দোলন করার জন্য বা কাউকে কাউকে টার্গেট করে বলির পাঁঠা বানানো হয়। জিয়াউল আহসান সেরকম একজন মানুষ। তাকে টার্গেট করে সমস্ত কিছুতে নাম যুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে। কারণ তার নাম যুক্ত করলে সমস্ত মিডিয়া ও ইউটিউবারদের জন্য খুব উপকার হয়।
বিদেশি আইনজীবী নিয়োগের আবেদন
শুনানিতে আইনজীবী নাজনীন নাহার ট্রাইব্যুনালকে জানান, যুক্তরাজ্যের নাইন বিআর চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন ওয়ালটন কে-কে নিয়োগ দিতে কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গত ২২ জানুয়ারি বার কাউন্সিলে আবেদন করেছিলেন জিয়াউল আহসান। যাকে নিয়োগ দেওয়া হবে, তিনিও বার কাউন্সিলে চিঠি দিয়েছেন।
নাজনীন নাহার বলেন, ‘কিন্তু অদ্যাবধি বার কাউন্সিল সেই আবেদন ফরোয়ার্ড করেনি বা কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বার কাউন্সিলকে নির্দেশনা দেওয়ার আবেদন করেছি আমরা।’
অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষ (প্রসিকিউশন) এর বিরোধিতা করে জানায়, বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল কিংবা প্রসিকিউশনের এখতিয়ারভুক্ত নয়। বার কাউন্সিল অনুমতি দিলে আসামি বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে পারবেন।
জবাবে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেন, বিষয়টি নিষ্পত্তির কথা বলার জন্য ট্রাইব্যুনাল ছাড়া তাদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নেই।
৫২টি বিষয়ের নথি তলবের আরজি
শুনানিতে সরকারি বিভিন্ন দফতরে থাকা ৫২টি বিষয়ের নথি চেয়ে আরেকটি আবেদন করেন আইনজীবী নাজনীন নাহার। তিনি বলেন, ‘শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে করা এ মামলায় সাক্ষীরা বিভিন্ন সময় যেসব তথ্য দিয়েছেন, তা সঠিক নয়। সত্য উদঘাটনের জন্য ওইসব ঘটনার সরকারি নথি প্রয়োজন।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা এর বিরোধিতা করে বলেন, এর আগে আসামিপক্ষ ২২টি বিষয়ের নথি চেয়েছিল, যা ট্রাইব্যুনাল বাতিল করে দিয়েছিলেন। এখন সেই ২২টিসহ মোট ৫২টি বিষয়ের নথি চাওয়া হয়েছে। দোষ বা নির্দোষ যাচাইয়ের জন্য এসব নথি জরুরি নয় বলে ট্রাইব্যুনালের আদেশের মাধ্যমে বিষয়টি আগেই নিষ্পত্তি হয়ে আছে।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় বর্তমানে ১৫তম সাক্ষী তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্যের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হয়েছে।
এর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্য উপস্থাপন শেষ হবে এবং এরপর যুক্তিতর্ক শুরু হবে। এ ছাড়া গুম, খুন ও নির্যাতনের আরও কয়েকটি মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়েছে।
আরএনবি/এফএ