Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

মানবতাবিরোধী অপরাধ: হানিফসহ চারজনের সর্বোচ্চ সাজা চায় প্রসিকিউশন

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০২:২৯ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে ‘দলীয় সিদ্ধান্তে’ হত্যাযজ্ঞ চালানোর অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফসহ চার আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে প্রসিকিউশন।

সোমবার (৫ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ মামলায় প্রসিকিউশনের জমা দেওয়া অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে এ আবেদন জানানো হয়।

আগামী ৭ অক্টোবর আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

যুক্তিতর্ক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রসিকিউটর গাজি এইচ তামিম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে তৎকালীন সরকার এবং আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের অংশ হিসেবে হানিফ সেই সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখেন।

একজন ‘বেসামরিক নেতা (সিভিলিয়ান লিডার)’ হিসেবে হানিফ তার অধীনস্থদের নির্দেশ দিয়ে এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন বলে দাবি করেছেন প্রসিকিউশন। প্রমাণ হিসেবে ট্রাইব্যুনালে তার টেলিফোন কথোপকথনের রেকর্ডও জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রসিকিউটর তামিম জানান, হানিফ তার সংশ্লিষ্ট জেলার এসপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের টেলিফোন করে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ ছাড়া তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের প্রতিটি সভায় উপস্থিত থেকে তিনি এসব নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমর্থন যুগিয়েছেন।

এর মধ্য দিয়ে হানিফ মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যা সংঘটনে সহায়তা (অ্যাবেট), সুবিধা প্রদান (ফ্যাসিলিটেট) এবং উল্লেখযোগ্য অবদান (সাবস্ট্যানশিয়াল কন্ট্রিবিউশন) রেখেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশন আরও যুক্তি দেখিয়েছে, দলের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে একই ধরনের অপরাধে ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনাল দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি দিয়েছেন।

দলের শীর্ষ নেতা ও সমপর্যায়ের নেতাদের মতো একই অবস্থানে থাকায় মাহবুবুল আলম হানিফের অপরাধও একইভাবে প্রমাণিত হবে— এমন আশা প্রকাশ করে আইনের অধীনে তার সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানিয়েছে প্রসিকিউশন।

মামলার অন্য তিন আসামি হলেন— কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি সদর উদ্দিন খান, জেলা সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং সাবেক সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা। এই মামলায় সব আসামিই পলাতক।

অভিযোগে যা রয়েছে

প্রসিকিউশনের দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে হানিফসহ চারজনের বিরুদ্ধে তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়। আন্দোলনকারীদের ঠেকাতে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাই যথেষ্ট বলে ওবায়দুল কাদের যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে হানিফ তাতে সমর্থন জানিয়েছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া ২০২৪ সালের ২৯ জুলাই কুষ্টিয়ায় এক বৈঠকে ছাত্র-জনতাকে হত্যার ব্যাপারে সরাসরি নির্দেশ দেওয়া, ষড়যন্ত্র করা এবং জুলাই-অগাস্ট মাসে আন্দোলন চলাকালে কুষ্টিয়া শহরে ৬ জনকে হত্যার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

প্রথম ধাপে গত ১১ মে মামলাটির যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হয়। তার আগে ২৩ এপ্রিল তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরার মধ্য দিয়ে ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণের পর্ব শেষ হয়েছিল।

এরপর গত ৭ জুন রাষ্ট্রপক্ষ তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন করে। ১০ জুন রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।

ওই দিন আসামিপক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আইনজীবী মো. আমির হোসেন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন এবং প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম তা খণ্ডন করেন।

তবে পরবর্তীতে মামলাটি আবারও যুক্তিতর্কের জন্য কার্যতালিকায় আসে। গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দিন ধার্য থাকলেও সেদিন শুনানি হয়নি। তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার সেটি কার্যতালিকায় ওঠে এবং যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে প্রসিকিউশন।

এর আগে, গত বছরের ২ নভেম্বর হানিফসহ এই চারজনের বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-২। তার আগে ৫ অক্টোবর প্রসিকিউশন তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেয় এবং ৬ অক্টোবর ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেন।

সেদিন ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে ১৪ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। পুলিশের পক্ষ থেকে আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানানো হলে ট্রাইব্যুনাল দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে তাদের হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।

পরে ২৩ অক্টোবর আসামিদের জন্য  রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ করে দেন ট্রাইব্যুনাল এবং ২৭ অক্টোবর অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করা হয়।

আরএনবি/এফএ