নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৬ পিএম
জুলাই আন্দোলনে রাজধানীর উত্তরায় মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধসহ ১১ জনকে হত্যার ঘটনায় ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক এমপি হাবিব হাসানসহ ২৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের দিন পিছিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) নির্ধারিত দিনে অভিযোগ গঠনের আদেশ না দিয়ে ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এ বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নতুন দিন ঠিক করেছে।
আদালতে এদিন রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। এ সময় চিফ প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন ও তারেক আবদুল্লাহ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী এম লিটন আহমেদ। পলাতক আসামিদের পক্ষে ‘স্টেট ডিফেন্স’ হিসেবে বক্তব্য উপস্থাপন করেন আমির হোসেন ও এম হাসান ইমাম। এছাড়া স্টেট ডিফেন্স শহিদুল ইসলামসহ অন্য আসামির আইনজীবীরাও এদিন শুনানি করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম জানান, মুগ্ধ হত্যা মামলায় ইতোমধ্যে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগ গঠনের ওপর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের শুনানিও শেষ হয়েছে। ১৬ সেপ্টেম্বর আদেশের জন্য দিন নির্ধারিত থাকলেও ট্রাইব্যুনাল তা পিছিয়ে ২৩ সেপ্টেম্বর ধার্য করেছে।
তিনি জানান, এ মামলায় পুলিশ সদস্য ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীসহ মোট ২৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে আটজন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে রয়েছেন, বাকি ১৮ জন পলাতক।
‘পিপাসার্তদের পানি দেওয়ার সময় টার্গেট করে হত্যা’
চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মুগ্ধ হত্যা মামলায় আমরা ফরমাল চার্জ (আনুষ্ঠানিক অভিযোগ) দাখিল করেছি। গত তারিখে চার্জ গঠনের শুনানি হয়েছে, আজকে (বুধবার) চার্জ গঠন হবে কি হবে না, সে বিষয়ে আদেশ হওয়ার কথা ছিল।’
আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মুগ্ধর অভিযোগটি একটি প্রতিষ্ঠিত অভিযোগ। মুগ্ধ যখন আন্দোলনকারীদের এবং পিপাসার্তদের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য পানি বিতরণ করছিল, সেই ছেলেটিকে টার্গেট করে গুলি করে হত্যা করা হয়।’
উত্তরাতে একই প্যাটার্নে ও পদ্ধতিতে প্রায় শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘তারই একটা পার্ট হচ্ছে মুগ্ধর ঘটনাটা। মুগ্ধর একটি পার্টে আমরা ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট বা ফরমাল চার্জ দিয়েছি। উত্তরাতে আরও ইনভেস্টিগেশন চলছে, রিপোর্ট সাপেক্ষে ভবিষ্যতে হয়তো আরও ফরমাল চার্জ আসতে পারে।’
অভিযোগে যা বলা হয়েছে
মামলার অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ ও ১৯ জুলাই উত্তরা এলাকায় মুগ্ধসহ ১১ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই মামলায় পৃথক দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রথম অভিযোগ: ১৮ জুলাই উত্তরার ৩ নম্বর সেক্টরে জুলাই আন্দোলনে আহতদের হাসপাতালে নিতে সহযোগিতার পাশাপাশি ছাত্র-জনতার মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণের সময় বিইউপির শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ গুলিবিদ্ধ হন। পরে ছাত্র-জনতার কয়েকজন তাকে উত্তরা ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
একই দিন উত্তরায় জাহিদুজ্জামান তানভীন, শেখ ফাহমিন জাফর, মো. শাকিল হোসেন, মো. সাব্বির হোসেন ও সজিব সরকারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া ওই দিন উত্তরায় একটি এপিসির (সাঁজোয়া যান) পেছনের চাকায় পিষ্ট করে উবারচালক মোখলেসুর রহমান দুর্জয়কে হত্যার অভিযোগও রয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগ: পরদিন ১৯ জুলাই উত্তরা এলাকায় রিদোয়ান শরীফ, মো. ছাব্বির ইসলাম, মো. আসাদুল্লাহ ও নাঈমা সুলতানাকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
অভিযোগ গঠনের শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ ২৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করেছিল। তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাদের অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানান।
গ্রেফতার আট আসামি
এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে থাকা আট আসামি হলেন- ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মির্জা সালাহউদ্দিন, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান, আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির সাবেক কনস্টেবল হোসেন আলী, উত্তরা পশ্চিম থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনোয়ার ইসলাম চৌধুরী রবিন, যুবলীগ সভাপতি দেলোয়ার হোসেন রুবেল, আওয়ামী লীগ নেতা সোহেল রানা, ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি শাহ আলম ও তুরাগ থানা এলাকার আওয়ামী লীগ কর্মী ইরফানুল হক গাজী।
পলাতক ১৮ আসামি
মামলার পলাতক ১৮ আসামির মধ্যে রয়েছেন—ঢাকা-১৮ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) মোহাম্মদ হাবিব হাসান, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, ডিএমপির উত্তরা বিভাগের সাবেক উপ-পুলিশ কমিশনার কাজী আশরাফুল আজীম, সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. তোহিদুল ইসলাম, সাবেক সহকারী পুলিশ কমিশনার সুমন কর, উত্তরা পশ্চিম থানার সাবেক ওসি বিএম ফরমান আলী, উত্তরা পূর্ব থানার সাবেক পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশনস) মাহমুদুল হাসান, সাবেক কনস্টেবল আবু ছায়েম, সাবেক এসআই খালেদ আনোয়ার ও সাবেক এএসআই মো. রোকনুজ্জামান।
পলাতক অন্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে যুবরাজ, সাবেক কাউন্সিলর ফরিদ আহমেদ, সাবেক কাউন্সিলর ডিএম শামীম, সাবেক কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈম, সাবেক কাউন্সিলর আফছার উদ্দিন খান, আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিন আল সোহেল, উত্তরা পশ্চিম থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি মুরতাফা বিন ওমর ওরফে সাথিল ও তুরাগ থানা যুবলীগ নেতা জাকির হোসেন ওরফে মিঠু।
আরএনবি/এমআই