Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

বিচারক নেই, সাতক্ষীরায় নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে মামলা প্রায় ৫ হাজার

জেলা প্রতিনিধি

১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৩৭ পিএম

সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের আটতলায় প্রতিদিনই আসেন বিচারপ্রার্থীরা। কেউ আসেন দূর-দূরান্ত থেকে সাক্ষী নিয়ে, কেউ আসেন শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে। আদালতে এসে জানতে পারেন, বিচারক নেই। ফলে নির্ধারিত তারিখে শুনানি হয় না। আবার নতুন তারিখ পড়ে। এভাবে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস ঝুুলে থাকায় ক্রমান্বয়ে বাড়ছে মামলার জট।

প্রায় এক বছর ধরে বিচারক না থাকায় সাতক্ষীরার এই গুরুত্বপূর্ণ ট্রাইব্যুনালে প্রায় পাঁচ হাজার মামলা বিচারাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা। শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন মামলাই নয়, আদালতটি শিশু আদালত ও মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার দায়িত্বও পালন করে। অথচ বিচারক না থাকায় এসব মামলার বিচার কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

এই মামলা জটের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রত্যন্ত এলাকার বিচারপ্রার্থীরা। আশাশুনি, শ্যামনগরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের আদালতে আসতে হচ্ছে। যাতায়াত, আইনজীবীর খরচ ও দিনের কাজের ক্ষতি, সব মিলিয়ে বিচারপ্রার্থীদের ওপর বাড়ছে আর্থিক চাপ। অথচ আদালতে এসে অনেক সময় তাদের ফিরতে হচ্ছে খালি হাতেই।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) শেখ আলমগীর আশরাফ বলেন, সাতক্ষীরা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞ বিচারক নেই। মামলাগুলো অসংখ্য জটের গোলকধাঁধায় পড়ে গেছে। প্রায় পাঁচ হাজার মামলা এই আদালতে পেন্ডিং আছে। এই আদালত শিশু আদালত ও মানব পাচার আদালতেরও দায়িত্ব পালন করে। ফলে ভুক্তভোগীরা দায়িত্বহীনতার শিকার হচ্ছেন। কর্তৃপক্ষের কাছে অতি দ্রুত একজন বিচারক নিয়োগের জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।

আশাশুনির তেঁতুলিয়া গ্রাম থেকে এক নারী তার মায়ের মামলার বিষয়ে আদালতে এসেছিলেন। তিনি বলেন, আমার মায়ের বিচারের জন্য এসেছি। কোর্টে আমাদের ডাক হয়নি। এখন এভাবেই বসে আছি।

আরেক বিচারপ্রার্থী জানান, একটি মামলার কাজে সকাল থেকে আদালতে অপেক্ষা করছেন। তার ভাষায়, অনেক কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। কোর্টে যাতে স্বল্প সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হয়, সেই সুযোগ আমরা পাচ্ছি না।

তারেক মনোয়ার নামের এক বিচারপ্রার্থী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেট না থাকায় বিচারপ্রার্থীদের সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আদালতে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। দ্রুত বিচারক নিয়োগ করে এই ভোগান্তি কমানোর দাবি জানাই।

শহিদুল ইসলাম নামের আরেক বিচারপ্রার্থী বলেন, বিচারক না থাকার কারণে হয়রান হচ্ছি। একই মামলার জন্য বারবার আসতে হচ্ছে। আমরা গরিব মানুষ, এভাবে বারবার হয়রানি হতে চাই না। স্বাভাবিকভাবে ন্যায্য বিচার চাই।

শিশু সন্তানকে নিয়ে আদালতে আসা এক নারী বলেন, বিচারক না থাকার কারণে সমস্যা হচ্ছে। বাচ্চারাসহ গরমের মধ্যে এভাবে হয়রানি না করলে হয় না। আমরা যেন দ্রুত বিচার পাই, সরকার সেই ব্যবস্থা করুক।

Satkhira1

আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাতক্ষীরায় শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালেই নয়, আরও কয়েকটি আদালতে বিচারক সংকট রয়েছে। জেলা আইনজীবী সমিতির নেতাদের দাবি, এ কারণে জেলার বিচারব্যবস্থায় সামগ্রিকভাবে চাপ তৈরি হয়েছে।

আইনজীবী বদিউজ্জামান বলেন, সাতক্ষীরায় প্রায় ২২ লাখ মানুষের বসবাস। অথচ প্রয়োজনের তুলনায় বিচারকের পদ শূন্য রয়েছে। তার দাবি, দ্রুত বিচারক নিয়োগ না হলে বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

শিমুল হোসেন নামের এক আইনজীবীর সহকারী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলায় বাদীপক্ষকে নিয়মিত আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। কিন্তু বিচারক না থাকায় মামলার কার্যক্রম এগোচ্ছে না। এতে বাদীরা হতাশ হচ্ছেন এবং তাদের সময় ও অর্থ দুটোই নষ্ট হচ্ছে।

মামলার জট কমাতে দ্রুত বিচারক নিয়োগের দাবিতে গত ২৩ আগস্ট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে লিখিত আবেদন করেছে সাতক্ষীরা জেলা আইনজীবী সমিতি।

আইনজীবী সমিতির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শূন্য ট্রাইব্যুনালে বিচারক নিয়োগের বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বিষয়টি বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

আইনজীবীদের দাবি, নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল মামলায় দীর্ঘসূত্রতা ভুক্তভোগীদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে। দ্রুত একজন বিচারক নিয়োগ দিয়ে ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা না হলে মামলার জট আরও বাড়বে। বিচারপ্রার্থীদেরও বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হবে।

প্রতিনিধি/এফএ