রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম
ফেনীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় ১৬ আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালের রায়কে ‘অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে ওই রায়ের বিচারককে দায়রা এখতিয়ার থেকে প্রত্যাহারের জন্য আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন (ডেথ রেফারেন্স), আপিল ও জেল আপিলের টানা ১৭ দিনের শুনানি শেষে গত ২৪ আগস্ট এ রায় দেন বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ।
সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে। মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজা।
বিচারকের সমালোচনা ও প্রত্যাহারের নির্দেশ
রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছে, ট্রাইব্যুনালের বিচারকের মধ্যে বিচারিক সংবেদনশীলতার অভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। দণ্ডবিধি ও সাজা প্রদান সংক্রান্ত বিধিমালাগুলোর মৌলিক বিষয় না শেখা পর্যন্ত তাকে দায়রা আদালতের এখতিয়ারের বাইরে রাখাই শ্রেয়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করে, ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি মোহাম্মদ শামীম, রুহুল আমিন, মাকসুদ কাউন্সিলর ও আফসারউদ্দীনের বিরুদ্ধে ন্যুনতম কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অথচ তাদের মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছিল। বিচার বুদ্ধিহীন এই দণ্ডের কারণে এই আসামিদের সাত বছরের বেশি সময় নির্জন কারাকক্ষে (কনডেম সেল) বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে; যা আসামিদের পরিবারের ওপর এক ধ্বংসাত্মক প্রভাব বয়ে এনেছে।
ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে মাত্র দুটির রায়কে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছে, ‘একটি সভ্য সমাজে এমন অবিবেচক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন সাজা বা রায় প্রত্যাশিত নয়।’
এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, একজন বিচারকের কোনো মামলায় দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের বিচারিক মন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, বিচারক মামুনুর রশিদ সেই বিচারিক মন প্রয়োগে ব্যর্থ হয়েছেন বলে হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ দিয়েছে।
তবে এ পর্যবেক্ষণ নির্দিষ্ট ওই বিচারকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, ঢালাওভাবে সব বিচারকের ক্ষেত্রে নয় বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
পাশাপাশি বিচারিক আদালতের রায়ের কঠোর সমালোচনা করেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী শিশির মনির। তিনি বলেন, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে এসেছে যে, বিচারিক আদালত কোনো বাছবিচার না করে ‘নির্বিচারে’ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।
হত্যার কারণ ও পরিকল্পনা
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মামলার ঘটনার আগে ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলা নুসরাত জাহান রাফির ‘শ্লীলতাহানি’ করেন। পরে ওই ঘটনায় করা মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি অন্যান্য দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সঙ্গে নুসরাতকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন।
শ্লীলতাহানির মামলা তুলে না নেওয়ার কারণেই মূলত নুসরাতকে হত্যা করা হয়। হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। নুসরাতকে হত্যা করে ‘আত্মহত্যা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য অধ্যক্ষের নির্দেশ বাস্তবায়ন করে তার মূল সহযোগী শাহাদাত হোসেন শামীম ও নুর উদ্দিন। মামলা প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় নুসরাতকে হত্যার জন্য শামীম, নুর উদ্দিন, জাবেদ ও জুবায়েরকে প্ররোচিত করেছিলেন অধ্যক্ষ।
তার নির্দেশ মোতাবেক এই হত্যার পরিকল্পনা, সহায়তা ও নকশা বাস্তবায়নের সঙ্গে সিরাজসহ ছয় আসামি জড়িত। বিষয়টি আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকা শাহাদাত হোসেন শামীমের বিষয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, আগে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিলেন তিনি। নুসরাত তা প্রত্যাখ্যান করায় শামীমের মধ্যে তার প্রতি আক্রোশ তৈরি হয়। সিরাজ-উদ-দৌলাকে গ্রেফতারের পর শামীম ‘অধ্যক্ষ মুক্তি পরিষদ’ এর আহ্বায়ক হন এবং সিরাজ উদ-দৌলার সঙ্গে কারাগারে ষড়যন্ত্র করেন। হত্যাকাণ্ডের সব প্রস্তুতি গ্রহণের বিষয়টিও তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও মামলার অন্যান্য আসামির জবানবন্দি থেকে স্পষ্ট হয়েছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছেন।
মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ও স্বীকারোক্তি
হাইকোর্ট বলেছেন, ভিকটিম নুসরাতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি ত্রুটিহীন ও গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। তার জবানবন্দিতে চারজন ব্যক্তির সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে।
এ ছাড়া দণ্ডিত আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি সত্য ও স্বেচ্ছাপ্রণোদিত বলে আদালত মনে করেন। রিমান্ডে আসামিদের নির্যাতন করা হয়েছিল মর্মে মামলার নথিতে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেছেন, জিজ্ঞাসাবাদের নামে রিমান্ডে নেওয়ার কারণেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিকে বিশ্বাসযোগ্যতাহীন করে তুলতে পারে না।
চারজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যাবজ্জীবন পাওয়া চার আসামি প্রত্যেকেই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে নিজেদের অপরাধের কথা স্বীকার করেছেন এবং সহ-আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য তা সমর্থন করেছে।
ঘটনার সময় নুসরাতকে আটকে হাত বাঁধা, কেরোসিন ঢালা ও আগুন দেওয়ার ঘটনায় চারজন জড়িত ছিলেন বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে এসেছে। তবে কে নুসরাতের হাত ধরেছিল এবং কে আগুন দিয়েছিল— এ বিষয়ে সাক্ষ্যপ্রমাণে কিছুটা বিভ্রান্তি থাকায় চারজন আসামির মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলে রায়ে তুলে ধরা হয়।
কার কী সাজা
দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের কয়েকটি নির্মম ঘটনার প্রেক্ষাপটে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির জন্য গত ১০ জুন বিশেষ এই হাইকোর্ট বেঞ্চ গঠন করে দেন প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী। শুনানি শেষে গত ২৪ আগস্ট এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
মৃত্যুদণ্ড বহাল: রায়ে হত্যার মূল হোতা সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা ও শাহাদাত হোসেন শামীমের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: সাজা কমিয়ে মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় চারজনকে। তারা হলেন— মাদরাসা ছাত্র নুর উদ্দিন, সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের ও উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন।
খালাস: এ ছাড়া সর্বোচ্চ শাস্তি বহাল রাখার মতো সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকায় অপর ১০ আসামিকে খালাস দেন হাইকোর্ট। তারা হলেন— সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদরাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, কামরুন নাহার মণি, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল রোহানী সিদ্দীকা, মাহবুবা তাসনিম আঁখি ও আল আমিন সিদ্দিকী।
আসামিপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজালাল, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ অন্যান্য আইনজীবীরা।
নৃশংস সেই ঘটনা ও দেশজুড়ে প্রতিবাদ
২০১৯ সালে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসা থেকে আলিম পরীক্ষা দিচ্ছিলেন নুসরাত। এর আগে ওই মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। ওই ঘটনায় নুসরাতের মা মামলা দায়ের করার পর সেই বছরের ২৭ মার্চ পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজকে গ্রেফতার করে।
সিরাজ গ্রেফতার হওয়ার পর তার পক্ষে নামে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনেও সক্রিয় ছিল মাদরাসার কিছু শিক্ষার্থী। মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকিও দেওয়া হচ্ছিল বলে নুসরাতের পরিবারের অভিযোগ।
এর মধ্যেই ৬ এপ্রিল পরীক্ষা শুরুর আগে পরীক্ষা কেন্দ্রের সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিদগ্ধ নুসরাতকে ঢাকায় এনে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছিল; টানা পাঁচ দিন নারকীয় যন্ত্রণা সহ্য করে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি।
নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার দুদিন পর তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান আটজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত হয়।
নুসরাতকে যখন ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়েছিল, তখনও তিনি বলছিলেন, তিনি প্রতিবাদ করে যাবেন। প্রতিবাদী এই তরুণীর নির্মম অপমৃত্যুর পর প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল দেশের বিভিন্ন প্রান্ত। বিচারের দাবিতে সেই সময় গোটা দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।
আরএনবি/এফএ