Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

চাঞ্চল্যকর নুসরাত হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হাইকোর্টের

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম

ফেনীর মাদরাসা শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় দুইজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল ও চারজনের মৃত্যুদণ্ডাদেশ কমিয়ে যাবজ্জীবন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ জনকে খালাস দেওয়ার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ১১২ পৃষ্ঠার এই রায় প্রকাশ করা হয়।

এর আগে ২৪ আগস্ট সোমবার বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন।

মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা দুই আসামি হলেন— সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা (৫৭) এবং শাহাদাত হোসেন শামীম (২০)।

যাদের যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে তারা হলেন— নূর উদ্দিন, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

খালাসপ্রাপ্তরা হলেন— কামরুন নাহার মনি, হাফেজ আব্দুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম, ইফতেখার উদ্দিন রানা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি ও মাদরাসার সাবেক সহ-সভাপতি রুহুল আমিন, আবছার উদ্দিন ও তৎকালীন কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর।

অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, রায়টি হচ্ছে এই ১৬ জন নিম্ন আদালত কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্যে আদালত দুজন আসামির মৃত্যুদণ্ডের রায়কে বহাল রেখেছেন। তারা হলেন এই মাদরাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ-দৌলা এবং শাহাদাত হোসেন শামীম। আদালত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে চারজনের সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছেন। তারা হলেন নুর উদ্দিন, জাবেদ, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জুবায়ের এবং উম্মে সুলতানা পপি।

১৬ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির মধ্য থেকে ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় কিংবা দণ্ডটি আদালতের দৃষ্টিতে বহাল থাকা উচিত নয় মর্মে ১০ জন ব্যক্তিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন— কামরুন নাহার মনি (ঘটনার সময় যিনি গর্ভবতী ছিলেন), হাফেজ মোহাম্মদ আবদুল কাদের, মহিউদ্দিন শাকিল, ইমরান হোসেন মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ, মোহাম্মদ শামীম ২, ইফতেখার উদ্দিন রানা, রুহুল আমিন, আবসার উদ্দিন এবং মাকসুদ কাউন্সিলর। এই ১০ জনের বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের দৃষ্টিতে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, এই রায়ের পরে আদালত নিম্ন আদালত কর্তৃক প্রদত্ত যে রায়, সেই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। এই মামলার নিম্ন আদালতের বিচারক যিনি ছিলেন, বিচারক মামুনুর রশিদ– তার সম্পর্কে আদালত বলেছেন যে একটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড প্রদানটা এটা অনেকটা মাইন্ডলেস সেন্টেন্স। অর্থাৎ আদালত তার বিচারিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তার পুরোপুরি মনের কিংবা বিচারিক যে জুডিশিয়াল মাইন্ড থাকা দরকার, তিনি সেটা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং তিনি এই রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে কার কীভাবে দণ্ড দেওয়া উচিত, মামলার ঘটনার সঙ্গে কার কতটুকু সম্পৃক্ততা– সেটাও আমলে নিতে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই বিচারক মামুনুর রশিদকে অবিলম্বে পেনাল এবং সেন্টেন্সিং– অর্থাৎ ফৌজদারি মামলার বিচার এবং সেক্ষেত্রে তার দণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্র থেকে তাকে সরিয়ে আনার জন্য আইন, বিচার এবং সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতি নির্দেশনা প্রকাশ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।

২০১৯ সালের  ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদারাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নুসরাতকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মামলা করেন তার মা শিরীন আখতার। এই মামলার জের ধরে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এরপর তার অনুগত কিছু ক্যাডার জনমত গঠন করে সিরাজকে জেল থেকে বের করে আনার জন্য। ৩ এপ্রিল খুনিরা সিরাজের সঙ্গে কারাগারে পরামর্শ করে এসে ৪ এপ্রিল মাদরাসার ছাত্রাবাসে নুসরাতকে খুন করার পরিকল্পনা করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৬ এপ্রিল নুসরাত মাদরাসায় আলিম পরীক্ষা দিতে গেলে পরিকল্পিতভাবে সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে নুসরাতকে হত্যা করে তারা।

ঘটনাস্থল থেকে নুসরাতকে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করে প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।  এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। অবস্থা সঙ্কটাপন্ন হওয়ায় সেখান থেকে নুসরাতকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল মারা যান নুসরাত।

এ ঘটনায় নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ এপ্রিল মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ২৮ মে অভিযোগপত্র দাখিলের পর ২০ জুন অভিযোগ গঠন করেন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক শেষে ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত রায়ের জন্য ২৪ অক্টোবর নির্ধারণ করেন। এই মামলায় ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক গ্রহণ করা হয়েছে। একই বছরের ২৪ অক্টোবর দেওয়া রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত।

এফএ