Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

অনলাইনে মাদকের বিজ্ঞাপন দিলেও শাস্তি, সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড

রথীন্দ্র নাথ বাপ্পি

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৫৮ এএম

বাংলাদেশে মাদকদ্রব্যের বিস্তার রোধ এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা বন্ধে আইনি কাঠামো আরও কঠোর করা হয়েছে। ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে সাইবার মাধ্যমে মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে মাদকের শ্রেণিবিভাগ অনুযায়ী শাস্তি এবং অন্যান্য অপরাধের দণ্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে।

নতুন আইনে মাদকদ্রব্য-সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারে ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান থাকায় ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ২২টি মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার।

ডিজিটাল মাধ্যমে মাদক অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা

গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে বিলটি উত্থাপন করেন। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল অ্যাপ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করে মাদক কেনাবেচা, বিজ্ঞাপন বা এ ধরনের অপরাধে সহায়তা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপরাধ সংঘটিত হলে অভিযুক্তের কাছ থেকে সরাসরি মাদক উদ্ধার না হলেও দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা যাবে। এ ধরনের অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক চক্র জড়িত থাকলে জরিমানার পরিমাণ ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে।

বিলে আদালত বা মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালকে এ ধরনের অপরাধে ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইস, অ্যাকাউন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম, ই-ওয়ালেট, ভার্চুয়াল সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ, বাজেয়াপ্ত, অপসারণ বা রাষ্ট্রের অনুকূলে ন্যস্ত করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

এছাড়া, মাদকপ্রবণ এলাকায় স্বতন্ত্র মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান পুনর্বহাল করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত আদালতে বিচার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার বিধানও বহাল রাখা হয়েছে।

বিলের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে ডগ স্কোয়াড গঠন এবং আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে।

মাদকের শ্রেণিবিভাগ ও বর্তমান দণ্ড

২০১৮ সালের মূল আইন ও পরবর্তী গেজেট অনুযায়ী মাদককে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। ‘ক’ (মারাত্মক) শ্রেণির মারাত্মক মাদকের মধ্যে রয়েছে হেরোইন, কোকেন, ইয়াবা (অ্যামফিটামিন), আইস, এলএসডি ইত্যাদি।

‘খ’ শ্রেণিতে (মাঝারি) গাঁজা, চরস, ভাঙ, হাশিশ এর মত মাদক। আর ‘গ’ শ্রেণিতে (কম ক্ষতিকর কিন্তু অপব্যবহারযোগ্য) আছে অ্যালকোহল, বিয়ার, বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ (ডায়াজেপাম, ফেনসিডিল)।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬ ধারা অনুযায়ী হেরোইন ও কোকেন ২৫ গ্রামের বেশি হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। ৫ গ্রামের নিচে হলে ১-৫ বছরের জেল।

আর ইয়াবা ২০০ গ্রাম (উৎপাদন/পরিবহন) অথবা ৪০০ গ্রাম (বিক্রি/সংরক্ষণ) এর বেশি হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। এর কম হলে পরিমাণভেদে ১ থেকে ১০ বছরের জেল। সেবনের শাস্তি ৩ মাস থেকে ২ বছরের কারাদণ্ড।

পাশাপাশি গাঁজা গাছ ৫০টির বেশি হলে ৭-১০ বছরের জেল। ১৫ কেজির বেশি গাঁজা উদ্ধারে একই সাজা। দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে সর্বোচ্চ সাজার দ্বিগুণ অথবা ন্যূনতম ২০ বছরের কারাদণ্ড।

উৎপাদন ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা

আইনের ৯ ধারায় অ্যালকোহল ছাড়া অন্যান্য মাদক এবং ১০ ধারায় অ্যালকোহলের উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বহন, কেনাবেচা ও সেবন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে লাইসেন্স বা পারমিট থাকলে চিকিৎসা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। লাইসেন্সের শর্ত ভঙ্গ করলে আগে ১ লাখ টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও ২০২৬-এর সংশোধনীতে তা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করা হয়েছে।

এছাড়া ধারা ৩৭ অনুযায়ী মাদক তৈরির সরঞ্জাম রাখলে ২-১০ বছরের জেল এবং ধারা ৩৮ অনুযায়ী মাদক অপরাধে নিজের বাড়ি বা যানবাহন ব্যবহার করতে দিলে ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

নতুন এই কঠোর আইন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডের বিধান নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

ন্যূনতম ৫ বছরের শাস্তিযোগ্য মাদক মামলার বিচারে ২২ ট্রাইব্যুনাল

মাদক মামলার বিচারে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জন্য ২২টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে সরকার। ৩ সেপ্টেম্বর আইন মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

ট্রাইব্যুনালগুলোর মধ্যে ঢাকা জেলার জন্য রয়েছে মাদকদ্রব্য অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, ঢাকা। পল্লবী, কাফরুল, মিরপুরসহ কয়েকটি এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর-১; কলাবাগান, ধানমন্ডিসহ কয়েকটি এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর-২; মতিঝিলসহ কয়েকটি এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর-৩; এবং উত্তরাসহ কয়েকটি এলাকার জন্য ঢাকা মহানগর-৪ গঠন করা হয়েছে।

এভাবে চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, কক্সবাজার, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, বগুড়া, দিনাজপুর ও যশোরে এক বা একাধিক ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এ প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের অধীন অন্যূন ৫ বছর বা তার বেশি শাস্তিযোগ্য অপরাধের চলমান মামলাগুলো বর্তমান আদালত থেকে নতুন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরিত হবে। কোনো মামলা যে পর্যায়ে স্থানান্তরিত হবে, সেই পর্যায় থেকে মামলার বিচারকাজ পরিচালিত হবে। এমন শাস্তিযোগ্য বিচারাধীন মাদকের মামলা আছে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৩৩টি। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর এলাকায় মামলা আছে ২১ হাজার ৯২০টি।

সাপ্লাই চেইন বন্ধ না করে শুধু সাজা বাড়িয়ে লাভ নেই

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান মনে করেন, শুধুমাত্র কঠোর আইন বা সাজা বাড়িয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। তার মতে, মূল সমস্যা ‘সাপ্লাই চেইন’ বা উৎপাদন বন্ধ করা। তিনি বলেন, “সাইবার অপরাধে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত না হয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। অনলাইনে অ্যানোনিমাস (বেনামি) প্রোফাইল ব্যবহার করে অপরাধ করলে প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করার প্রযুক্তি এখনও দেশে পুরোপুরি নেই। ফলে ভুল বিচারে নিরপরাধ ব্যক্তির দণ্ড হওয়ার বা অপপ্রয়োগের সুযোগ থাকে।”

তিনি সাজা বাড়ানোর চেয়ে দ্রুত তদন্ত ও নির্ভুল সাক্ষ্য-প্রমাণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন।

আইনের কার্যকারিতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন এই আইনজীবী। তিনি মনে করেন, মাদকের মূল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) বন্ধ না করে কেবল বিক্রির পর্যায়ে সাজা বাড়িয়ে বড় কোনো পরিবর্তন সম্ভব নয়।

MADAK
মাদকে কিশোর-তরুণদের আসক্তিও আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। 

হাবিবুর রহমানের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অপরাধীদের পরিচয় গোপন রাখার (অ্যানোনিমাস) সুযোগ থাকায় তাদের শতভাগ নির্ভুলভাবে শনাক্ত করার প্রযুক্তি এখনও দেশে পর্যাপ্ত নয়। এই অবস্থায় প্রযুক্তিগত প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে মৃত্যুদণ্ডের মতো সাজা দেওয়া হলে ভুল বিচারের ঝুঁকি থেকে যায়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, ডিজিটাল মাধ্যমে পরিচয় জালিয়াতি করে অন্য কাউকে ফাঁসানোর সুযোগ থাকায় নিরপরাধ ব্যক্তিরা ‘ফলস কনভিকশন’-এর শিকার হতে পারেন।

তিনি আরও বলেন, তদন্ত পর্যায়ে ঘাটতি থাকলে এবং অপরাধ প্রমাণ করা না গেলে স্রেফ সাজা বাড়িয়ে লাভ হবে না। বরং এতে বিচারে সাজার হার (কনভিকশন রেট) কমে যেতে পারে, কারণ অস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত সাজা দিতে চাইবে না। তার মতে, সাইবার স্পেসে মাদক তৈরি হয় না, তাই অনলাইন নজরদারির চেয়ে অফলাইনে মাদক উৎপাদন ও বিপণন বন্ধে গুরুত্ব দেওয়া এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোই এখন মূল কাজ হওয়া উচিত।

কঠিনতম আইন এখন সময়ের দাবি: মনজিল মোরসেদ

জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই কঠোর আইনকে বর্তমান পরিস্থিতির প্রয়োজনে অপরিহার্য বলে মনে করেন। তিনি বলেন, ‘মাদক এখন ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছে। অনলাইনে কেনাবেচা ব্যাপক বেড়েছে। সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে এই কঠিন আইন প্রয়োজন ছিল।’

অপপ্রয়োগের শঙ্কা সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আইনের অপপ্রয়োগ বাংলাদেশে অহরহ ঘটছে, এটা সত্য। কিন্তু ইয়াবার মতো মাদকের সাজা কম থাকায় অপরাধীরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। সাজা কঠোর হলে জামিন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।’

মনজিল মোরসেদের মতে, অনলাইনে মাদক কেনাবেচা ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও আসক্ত হয়ে পড়ছে। সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি ছিল।

আইনের অপপ্রয়োগের শঙ্কা উড়িয়ে না দিলেও মনজিল মোরসেদ মনে করেন, বর্তমান ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ফেক আইডি বা হ্যাকিং শনাক্ত করা এখন অনেক সহজ। কেউ যদি নিজের আইডি হ্যাক হওয়ার বিষয়টি পুলিশকে আগে থেকে জানিয়ে রাখে, তবে তার ফেঁসে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। এছাড়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার আগে উচ্চ আদালতে কয়েক ধাপে পর্যালোচনার সুযোগ থাকায় ভুল বিচারের সম্ভাবনা কমে আসে।

তিনি আরও পর্যবেক্ষণ দেন যে, আগে সাজার পরিমাণ কম থাকায় মাদক ব্যবসায়ীরা খুব সহজেই আদালত থেকে জামিন পেয়ে যেত। এখন সাজা কঠোর হওয়ার ফলে জামিন প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হবে, যা মাদক নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। এছাড়া মাদক ব্যবসায়ীরা এখন নারী ও শিশুদের ‘ক্যারিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করে অল্প পরিমাণে মাদক পাঠায় যাতে আদালত সহনশীল দৃষ্টিতে দেখে। কঠোর আইন এই কৌশল রুখতে কার্যকর হবে। তবে সীমান্তে বর্ডার গার্ড ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গাফিলতি থাকলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

আরএনবি/এমআর