Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

‘মিডিয়া ট্রায়ালে বিচারকদের ওপর চাপ ও গণহারে ফাঁসি দেওয়া বিপজ্জনক’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৪ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৫ পিএম

চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখে বিচারকদের ‘গণহারে মৃত্যুদণ্ড’ দেওয়ার প্রবণতাকে ‘বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী তাজুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, বাছবিচার ছাড়াই এভাবে রায় দেওয়ার প্রবণতা ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের।

সোমবার (২৪ আগস্ট) নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন।

বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বিশেষ বেঞ্চ আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন।

আইনজীবী তাজুল ইসলাম এই মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নূরউদ্দীনের আইনজীবী ছিলেন। নিম্ন আদালত নূরউদ্দীনকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও হাইকোর্ট আজ তার সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন।

এ দিন উচ্চ আদালত বিচারিক আদালতের ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে দুইজনের বহাল রাখেন, চারজনকে যাবজ্জীবন এবং ১০ জনকে খালাস দেন।

তাজুল ইসলাম নিম্ন আদালতের রায়ের সমালোচনা করে বলেন, যেকোনো মার্ডার কেস যখন মিডিয়ায় ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমে সেনসেটাইজড (সংবেদনশীল) করা হয়, তখন বিচারকদের ওপর এক ধরনের মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়। এই চাপের মুখে অনেক সময় বাছবিচার ছাড়াই গণহারে ফাঁসির রায় প্রদান করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা অনেকগুলো মামলায় লক্ষ করেছি যে এরকম ব্যাপকভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আজকের রায়ে হাইকোর্ট একটি বড় ফাইন্ডিং দিয়ে বলেছেন যে, এই ধরনের প্রবণতা বিপজ্জনক। সংশ্লিষ্ট বিচারকের আইনের জ্ঞান এবং সেন্টেন্সিং (সাজা নির্ধারণ) সম্পর্কে অভিজ্ঞতার স্বল্পতা নিয়ে হাইকোর্ট আলোকপাত করেছেন এবং ওই বিচারককে বিচার কাজ থেকে বিরত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।

ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই আইনজীবী বলেন, ১৬৪ ধারার স্টেটমেন্টের ওপর এই যে ব্যাপক নির্ভরতা, এটি ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা। বিশেষ করে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে আসামিকে দীর্ঘ সময় আটকে রেখে জোর করে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। এই জুরিসপ্রুডেন্স থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।

তিনি আরও বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার রায়ে হাইকোর্ট ১৬৪ ধারার নির্ভরতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে এই সংস্কৃতি বদলাতে সাহায্য করবে।

তাজুল ইসলাম মনে করেন, অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর আসামির সাজা কী হবে, তা নির্ধারণে বাংলাদেশে আলাদা কোনো যুক্তিতর্ক হয় না, যা বিদেশের আদালতে বিদ্যমান। তিনি বলেন, এই বিষয়ে একটি ইনস্টিটিউশনাল গাইডলাইন থাকা জরুরি। বিচারকদের ওপর যাতে সামাজিক চাপ কাজ না করে এবং তারা যাতে আইন অনুযায়ী সঠিক সাজা দিতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

ফেনির সোনাগাজী মাদরাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার দায়ে ২০১৯ সালে ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ।

আজ সেই রায়ের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তাকে আইন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

আরএনবি/এফএ