Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

অংশীদারি চুক্তিতে প্রতারণা শুধু দেওয়ানি বিরোধ নয়, ফৌজদারি মামলাও চলবে

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:১৯ পিএম

ব্যবসায়িক লেনদেন বা অংশীদারি চুক্তির সুযোগ নিয়ে অসৎ উদ্দেশে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসভঙ্গ করা হলে তাকে কেবল ‘দেওয়ানি বিরোধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে ফৌজদারি বিচার কার্যক্রমও স্বাধীনভাবে চলতে পারে বলে যুগান্তকারী রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

‘মো. শাহ আলম বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলায় বিচারপতি মো. বজলুর রহমান এবং বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়েরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছে। 

গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত এই রায়ের অনুলিপি রোববার (২৩ আগস্ট) প্রকাশিত হয়েছে।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, অংশীদারি চুক্তির শুরুতেই যদি প্রতারণামূলক অভিপ্রায় বা অসাধু উদ্দেশে অর্থ আত্মসাতের উপাদান থাকে, তবে তা ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

আরও পড়ুন: গুম-হত্যা মামলায় ফজলে করিম-জিয়াউলের তদন্ত প্রতিবেদন ২৫ অক্টোবর

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, রাজধানীর মিরপুর রোডের গাউছিয়া মার্কেটের একটি দোকানের মালিক শাহ আলমের সঙ্গে অংশীদারি চুক্তিতে লভ্যাংশ প্রদানের শর্তে ব্যবসা শুরু করেন কাপড় ব্যবসায়ী মো. জাহিদ খান। ২০১২ সালে শাহ আলম দোকানটি ১ কোটি ৭ লাখ টাকায় জাহিদ খানের কাছে বিক্রির চুক্তি করেন। চুক্তির সমঝোতা অনুযায়ী জাহিদ খান বিভিন্ন সময়ে মোট ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।

পরবর্তীতে দোকানটি রেজিস্ট্রি করে দিতে শাহ আলম টালবাহানা শুরু করলে দোকান মালিক সমিতি সালিশি বৈঠক করে পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু শাহ আলম অর্থ প্রাপ্তি ও চুক্তির বিষয়টি অস্বীকার করেন এবং জাহিদ খানকে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

এ ঘটনায় ২০২৩ সালে জাহিদ খান ঢাকার সিএমএম আদালতে দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় একটি সি.আর. মামলা দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্ত শেষে ওই বছরেই শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জ ফ্রেম) করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট।

আরও পড়ুন: ইলিয়াস আলী গুম: উইং কমান্ডার সাইফুরকে ট্রাইব্যুনালে হাজির

আইনি লড়াই

অধস্তন আদালতের ওই আদেশ স্থগিত ও মামলা বাতিল চেয়ে ২০২৪ সালে ফৌজিদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারার অধীনে হাইকোর্টে আবেদন করেন শাহ আলম। তার দাবি ছিল, এটি মূলত একটি অংশীদারি চুক্তি বাস্তবায়নের বিষয় এবং দেওয়ানি বিরোধের এখতিয়ারভুক্ত, তাই এখানে ফৌজদারি বিচার চলে না।

হাইকোর্ট প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করে বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত করেছিলেন। তবে চূড়ান্ত শুনানিতে জাহিদ খানের আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ যুক্তি দেখান যে, চুক্তির শুরুতেই অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে অর্থ গ্রহণ ও আত্মসাৎ করা ফৌজদারি অপরাধ। তিনি এ সংক্রান্ত আপিল বিভাগের একাধিক নজির আদালতে উপস্থাপন করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়েরের লেখা ১৭ পৃষ্ঠার রায়ে বলা হয়, নালিশি দরখাস্তে আসামির বিরুদ্ধে শুরু থেকেই প্রতারণামূলক অভিপ্রায় এবং অর্থ আত্মসাতের সুস্পষ্ট অভিযোগ করা হয়েছে। আসামি প্রকৃতপক্ষে দোকানের মালিক ছিলেন কি না বা তিনি অর্থ পেয়েছিলেন কি না—এসব বিষয় বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে। এই পর্যায়ে হাইকোর্ট এতে হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

আরও পড়ুন: নুসরাত হত্যা মামলা: হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের রায় সোমবার 

হাইকোর্ট আরও বলে, বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করার পর লেনদেন অস্বীকার করা এবং প্রতিশ্রুতি পূরণে অস্বীকৃতি জানানো ‘আমানত গচ্ছিত রাখার’ প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণ করে। এতে আদালতের প্রক্রিয়ার কোনো অপব্যবহার হয়নি।

চূড়ান্ত আদেশ

আবেদনকারীর পক্ষের বক্তব্যে কোনো সারবত্তা না পাওয়ায় হাইকোর্ট আগে জারি করা রুলটি খারিজ করে দিয়েছেন। একইসঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্র্বতীকালীন স্থগিতাদেশ বাতিল করে অধস্তন আদালতে থাকা মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতে শাহ আলমের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবুল কাশেম। জাহিদ খানের পক্ষে ছিলেন মো. নিয়াজ মোর্শেদ। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সালমা সুলতানা ও নজরুল ইসলাম ছোটন।

আরএনবি/এএইচ