Dhaka Mail Logo

আইন-আদালত

‘আবুল হাসনাতের হুকুম ছাড়া এলাকায় গাছের পাতাও নড়ে না’

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৮ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

বরিশাল এলাকায় সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য ও তার নির্দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা দিয়েছেন এক পুলিশ কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে তিনি জানান, তৎকালীন পুলিশ সুপার তাকে জানিয়েছিলেন— হাসনাত আব্দুল্লাহর নির্দেশ ছাড়া ওই এলাকায় ‘গাছের পাতাও নড়ে না’।

২০১৫ সালে বরিশালে ছাত্রদল ও জাসাসের দুই নেতাকে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সোমবার ট্রাইব্যুনাল-২ এ সাক্ষ্য দেন এএসআই মো. রাজু আহমেদ। বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তিনি সপ্তম সাক্ষী হিসেবে হাজির হন।

বর্তমানে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী থানায় কর্মরত রাজু আহমেদ ঘটনার সময় বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় কর্মরত ছিলেন। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি তুলে ধরেন সেই রাতের  বর্ণনা।

সাক্ষী রাজু আহমেদ জানান, ২০১৪ সালের শেষভাগ থেকে ২০১৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি আগৈলঝাড়া থানায় কর্মরত ছিলেন। ২০১৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ওয়ারেন্ট তামিল শেষে থানায় ফেরার পর রাতে তাকে ও এএসআই মোস্তাফিজুর রহমানকে তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) এ কে এম এহসান উল্লাহর কক্ষে ডাকা হয়।

রাজু আহমেদ বলেন, ‘এসপি স্যার মোস্তাফিজ স্যারকে বলেন—‘ঢাকায় দুজন আসামি ধরা পড়েছে, তাদের নিয়ে অভিযানে যেতে হবে। অভিযানে গোলাগুলি হতে পারে এবং আসামি দুজনকে মাইনাস করা লাগতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এএসআই মোস্তাফিজ যখন ‘মাইনাস করা’র অর্থ জানতে চান, তখন এসপি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন— ‘বেটা মাইনাস করা কি বুঝিস না? প্রয়োজনে ডাইরেক্ট হিট করবা।’

সাক্ষ্য অনুযায়ী, এএসআই মোস্তাফিজ এই কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে এসপি তাকে গালাগাল করেন এবং রাজু আহমেদকে একই প্রশ্ন করেন। রাজু নিজেকে ‘নতুন মানুষ’ দাবি করে অপারগতা প্রকাশ করলে এসপি এহসান উল্লাহ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন।

সাক্ষী আদালতকে বলেন, ‘এসপি স্যার আমাকে ধমক দিয়ে বলেন—‘বেটা মফিজের বাচ্চা, হাঁটুর নিচে বুদ্ধি তোমার। তোমরা এখানে কার চাকরি করো জানো? আমি আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহর নির্দেশে এসেছি। তোমরা কি জানো তিনি হচ্ছেন এই এলাকার সিংহ পুরুষ? তার হুকুম ছাড়া এই এলাকায় একটি গাছের পাতাও নড়ে না।’

রাজু আহমেদ জানান, পরদিন সকালে তিনি জানতে পারেন উজিরপুর থানা থেকে আনা টিপু ও কবির নামে দুই ব্যক্তিকে রাতে ‘ক্রসফায়ারে’ হত্যা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন, উজিরপুর থানার এএসআই মাহবুব ও এএসআই জসিম এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ায় আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ তার ক্ষমতার অপব্যবহার করে ছাত্রদল নেতা টিপু ও জাসাস নেতা কবিরকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। তার নির্দেশেই তৎকালীন এসপি এহসান উল্লাহ উজিরপুর থানা পুলিশকে দিয়ে গ্রেফতারের পর আগৈলঝাড়া বাইপাস সড়কে ‘ক্রসফায়ারের নাটক’ সাজিয়ে তাদের হত্যা করান।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বরে নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থায় অভিযোগ করা হয়।

তদন্ত শেষে চারজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হলে ট্রাইব্যুনাল বিচার শুরু করেন।

মামলার প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুফাতো ভাই আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ এবং তৎকালীন এসপি এ কে এম এহসান উল্লাহ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।

আদালত হাসনাত আব্দুল্লাহকে আনুষ্ঠানিকভাবে পলাতক ঘোষণা করে বিচার কাজ চালাচ্ছেন।

অন্য দুই আসামি সাবেক এএসআই মাহাবুল ইসলাম ও জসিম উদ্দিন গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।

আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ ও সহিদুল ইসলাম সরদার। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী আবুল হাসান এবং রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন।

আরএনবি/এফএ