মোস্তফা ইমরুল কায়েস
০৮ জুন ২০২৬, ০১:৩০ পিএম
রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রায় ঘোষণা হয়েছে। বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে, বিশেষ করে নারী ও শিশু নির্যাতনসংক্রান্ত মামলায়, এত দ্রুত বিচার ও রায় বিরল ঘটনা। ফলে একদিকে যেমন রায়টি জনমনে স্বস্তি ও সন্তোষ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে নতুন কিছু প্রশ্নও সামনে এসেছে।
নিম্ন আদালতের দেওয়া এই রায় কি উচ্চ আদালতের পরীক্ষায় টিকবে? নাকি আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির পর্যায়ে এসে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি হবে? উচ্চ আদালত কি রায় বহাল রাখবে, নাকি সাজা কমানো বা বাতিলের মতো কোনো সিদ্ধান্ত আসতে পারে? একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রামিসা মামলার মতো দ্রুত বিচার কি নারী ও শিশু নির্যাতনের অন্যান্য আলোচিত মামলাতেও সম্ভব?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের আইনজীবী, পাশাপাশি একজন অপরাধবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা হয়েছে এ প্রতিবেদকের। তারা আইন, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং অতীতের নজিরের আলোকে নিজেদের মতামত তুলে ধরেছেন। যদিও আইনজীবীদের কেউ কেউ বলছেন, নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা উচ্চ আদালতে পরিবর্তন, স্থগিত বা বাতিল হওয়ার বহু নজির রয়েছে; আবার অন্যদের মতে, মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে বিচার সম্পন্ন হওয়া কোনোভাবেই রায়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, যদি বিচারিক প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান ঢাকা মেইলকে বলেন, রামিসা হত্যা মামলায় মাত্র পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে রায় হওয়া অবশ্যই প্রশংসনীয় এবং এ কারণে বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার বিচার তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। তবে এ ঘটনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—অন্যান্য মামলাগুলো কেন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি হচ্ছে না?
আইনজীবী বলেন, বর্তমানে দেশে বিচারাধীন মামলার তুলনায় বিচারকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। বিদ্যমান জনবল দিয়ে লাখ লাখ মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা বাস্তবসম্মত নয়। বিচারপ্রক্রিয়া গতিশীল করতে হলে বিচারকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সহায়তা ও অবকাঠামোও শক্তিশালী করতে হবে।
ইসরাত হাসান বলেন, শুধু আলোচিত মামলাই নয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের সব মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন হওয়া উচিত। কারণ প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারই দ্রুত বিচার প্রত্যাশা করে। কিন্তু উচ্চ আদালতে বিচারকের সীমিত সংখ্যার কারণে বিপুলসংখ্যক মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিচারক সংখ্যা না বাড়ালে গণমাধ্যমে আলোচিত মামলাগুলো অগ্রাধিকার পেলেও অসংখ্য অন্যান্য মামলার বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকার আশঙ্কা থেকে যায়।
রামিসা হত্যা মামলার রায় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিম্ন আদালত ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য প্রমাণ-উপাদান পর্যালোচনা করেই রায় দিয়েছেন। তাই এই রায় উচ্চ আদালতে গিয়ে কোনো বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়বে বলে তিনি মনে করেন না।
তবে দ্রুত বিচারকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও এর মধ্যে এক ধরনের বৈষম্যের প্রশ্নও দেখেন তিনি। তার মতে, যেসব ঘটনা ব্যাপকভাবে গণমাধ্যমে প্রচার পায়, সেগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন হলেও অনেক কম আলোচিত মামলার ভুক্তভোগীরা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। এতে স্বাভাবিকভাবেই তাদের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে—তাদের মামলা আলোচনায় না আসার কারণেই কি তারা দ্রুত বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন? যখন কোনো মামলার রায় পাঁচ কার্যদিবসে হয়, আর অন্য মামলায় চার-পাঁচ বছর লেগে যায়, তখন এমন প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রামিসা ধর্ষণপরবর্তী হত্যাকাণ্ডের রায় নিম্ন আদালতে হলেও সেটি উচ্চ আদালতে গিয়ে স্থগিত হতে পারে। এমন ঘটনার নজির দেশের বিচারব্যবস্থায় অনেক রয়েছে বলে মনে করেন ঢাকা জজকোর্টের আইনজীবী এম কাওসার আহমেদ। তার মতে, হাইকোর্ট যদি মনে করেন যে, নিম্ন আদালতের সাজা বেশি হয়েছে, তবে তা কমিয়ে দিতেও পারেন। নিম্ন আদালতে সর্বোচ্চ সাজার রায় হয়েছে, কিন্তু সেটি হাইকোর্ট ডিভিশনে যাওয়ার পর সেখান থেকে আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে- এরকম শত শত নজির আছে।
আরও পড়ুন
সোহেল-স্বপ্নাকে যথাযথ শাস্তি না দিলে আদালত ব্যর্থ হবে: বিচারক
‘রামিসা হত্যার রায়ে আমরা সন্তুষ্ট, যত দ্রুত সম্ভব নিষ্পত্তি’
তিনি মনে করেন, রাসিমা হত্যাকাণ্ডটি শুধু গণমানুষের সিমপ্যাথির জন্য দ্রুতবিচার করে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। আবার বিচারক যদি মনে করেন, তার সামনের রেকর্ড, মামলার এফআইআরে সাক্ষীদের বর্ণনা, জেরা এবং ১৬৪ ধারায় জবানবন্দী বিবেচনায় এটা কোনোভাবে সঠিক হয়নি, সেটা আদালত তার মতো করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কারণ আদালত এক্ষেত্রে স্বাধীন।
তবে এই ঘটনার রায়কে তিনি ইতিবাচক হিসেবেই দেখেন। তিনি মনে করেন, এই রায় এ সমাজের জন্য একটা বার্তা। অন্যথায় সমাজের নরপশুরা বেপরোয়া হয়ে ওঠবে। তবে এই রায় শুধু অপরীদের নয়, তাদের সহযোগীদের কাছেও একটা বার্তা দিয়েছে। তিনি বলেন, সরকার সদিচ্ছা পোষণ করলে অনেক মামলার রায় দ্রুতই নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
রামিসা ঘটনায় রায়ের পর এখন কী কী ঘটতে পারে, তা ব্যাখ্যা করে আইনজীবী এম কাওসার আহমেদ বলেন, কোনো মামলায় নিম্ন আদালত মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় কার্যকরের আগে তা অনুমোদনের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে যেতে হয়। অর্থাৎ হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন ছাড়া মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করা যায় না। তিনি বলেন, এ সময়ের মধ্যে আসামিপক্ষ সাত দিনের সময় পায়। এই সাত দিনের মধ্যে তারা আপিল করতে পারে। সাধারণত সরকারের পক্ষ থেকে পাঠানো ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিপক্ষের আপিল—দুটোরই একসঙ্গে শুনানি হয়ে নিষ্পত্তি হয়।
হাইকোর্ট বিভাগ নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখলে আসামিপক্ষ চাইলে আপিল বিভাগে আপিল করতে পারে। আপিল বিভাগে আপিল করা হলে সাধারণত নিম্ন আদালতের আদেশ স্থগিত (স্টে) হয়ে যায়। কারণ আপিল বিভাগ রায় না দেওয়া পর্যন্ত মামলাটি এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ বিচারাধীন (পেন্ডিং) অবস্থায় থাকে। ফলে ওই সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর করা হয় না।
তিনি জানান, এরপরও যদি আপিল বিভাগে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকে, তাহলে আসামিপক্ষ আপিল বিভাগেই রিভিউ পিটিশন দায়ের করতে পারে। আইনজীবী বলেন, এ পর্যায়ে সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনো করণীয় থাকে না। রিভিউ পিটিশনের নিষ্পত্তির পর আসামির সামনে যে সর্বশেষ সুযোগ থাকে, তা হলো রাষ্ট্রপতির কাছে অনুকম্পা বা প্রাণভিক্ষা চাওয়া।
আরও পড়ুন
রায় শুনে রামিসার বাবা বললেন- ‘আলহামদুলিল্লাহ’
রামিসা হত্যার বিচার: আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীর
আইনজীবী বলেন, এটি একটি সাংবিধানিক বিধান। আসামি প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি চাইবেন না, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব বিষয়। এ ক্ষেত্রে সরকারেরও কিছু করার থাকে না। সাধারণত রাষ্ট্র এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না।
রাষ্ট্রপতি যদি ক্ষমা করেন, তাহলে আসামি ক্ষমাপ্রাপ্ত হবেন। অন্যথায় সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর আদালতের রায় কার্যকর হবে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর শুধু রামিসার মামলাতেই নয়, নারী ও শিশু নির্যাতনের সব মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। রামিসা মামলার রায় যেন দেশের অন্যান্য বিচারপ্রক্রিয়ারও একটি দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠে।
তিনি মনে করেন, রামিসার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায় সম্ভাব্য অপরাধীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে। শাস্তির ভয় অপরাধপ্রবণ ব্যক্তিদের এ ধরনের অপরাধ থেকে বিরত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিম্ন আদালতে দ্রুত রায় হলেও অনেক সময় মামলাগুলো উচ্চ আদালতে দীর্ঘদিন ঝুলে থাকে। এতে অপরাধীদের মধ্যে শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয় এবং নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ড. তৌহিদুল হক বলেন, নিম্ন আদালত সর্বোচ্চ শাস্তি দিলেও তা মাসের পর মাস বা বছরের পর বছর উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকলে মানুষের বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়। এর ফলে অপরাধ বাড়ে এবং অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
তিনি আশা প্রকাশ করে, রামিসা মামলার রায় দ্রুত কার্যকর করার ক্ষেত্রে উচ্চ আদালতও দ্রুত সিদ্ধান্ত দেবে এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা করবে।
এমআইকে/জেবি