বোরহান উদ্দিন
০৫ আগস্ট ২০২৬, ১০:২৮ এএম
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। একাধারে তিনি একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও অভিজ্ঞ রাজনৈতিক কর্মী। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহবুব উদ্দিন খোকন নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্যও।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল দিনগুলোতে আইনজীবীদের সংগঠিত করা এবং রাজপথে সরাসরি পুলিশের মুখোমুখি হয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য আলোচিত হয়েছেন।
ঢাকা মেইলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় নিশ্চিত গ্রেফতার হতে পারেন জেনেও পুলিশের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলার গল্প। তবে যে প্রত্যাশা নিয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল তা এখনো পূরণ হয়নি বলে মনে করেন বিশিষ্ট এই আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তার সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা মেইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বোরহান উদ্দিন।
ঢাকা মেইল: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠনগুলোও সক্রিয় ছিল। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে আপনাকে পুলিশের সামনে প্রতিবাদ করতে দেখা গেছে। এই আন্দোলনে কেন সব পেশার মানুষ একাত্ম হয়েছিল বলে মনে করেন?
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: আমি একজন পেশাজীবীর পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক কর্মী। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি যে, বাংলাদেশে কোনো ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয়। জুলাই আন্দোলনটি শুধু সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের লড়াই ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিদ্যমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। সেই বৈষম্য দূর করার তাগিদ থেকেই আমি এই আন্দোলনকে সমর্থন করেছি। সেই সময় অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেফতার ছিলেন, তবু আমি জেনেশুনেই ঝুঁকি নিয়ে মাঠে নেমেছিলাম।
ঢাকা মেইল: সেদিন আপনি নিজেও গ্রেফতার হতে পারতেন। পুলিশের মুখোমুখি হওয়ার সেই মুহূর্তের কথা যদি একটু বলতেন।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: আমি যখন আদালত চত্বরের ভেতর থেকে বের হচ্ছিলাম, তখন আমি শতভাগ নিশ্চিত ছিলাম যে, আমাকে গ্রেফতার করা হতে পারে। কিন্তু আমি দেখছিলাম অসংখ্য মানুষ প্রাণ দিচ্ছে, শত শত মানুষ আহত হচ্ছে এবং জেলে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় নিজের নিরাপত্তা বা কারাবরণের ভয় না করে এই নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটাকেই আমি সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। আমি জানতাম আমাকে জেলে যেতে হতে পারে, আর সেই মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আমি পুলিশের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম।
ঢাকা মেইল: আন্দোলনের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা হয়েছিল তা কতটা পূরণ হয়েছে বলে মনে করেন?
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: আমাদের সমাজব্যবস্থায় দীর্ঘকাল ধরে শোষিত ও শাসিত—এই দুই শ্রেণি তৈরি হয়েছে। একদিকে লুটেরা গোষ্ঠী জাতীয় সম্পদ আত্মসাৎ করছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানুষ একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিল, যেখানে বেকারত্ব থাকবে না এবং রাষ্ট্র দরিদ্র মানুষের দায়িত্ব নেবে। এই স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে রাষ্ট্রকে জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে, যা এখন পর্যন্ত সেভাবে দৃশ্যমান হয়নি।
ঢাকা মেইল: আদালত অঙ্গনে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বর্তমানে এই অভিযোগ এবং বাস্তবতা সম্পর্কে জানতে চাই।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: সত্যি বলতে, আদালত অঙ্গনে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো বড় পরিবর্তন আসেনি। সুপ্রিম কোর্ট বর্তমানে প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে কারণ সেখানে বিচারপতির চরম সংকট রয়েছে। মাত্র কয়েকজন বিচারপতি দিয়ে কাজ চালানোর ফলে হাজার হাজার মানুষ বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাইকোর্ট বিভাগে জামিনের জন্য আবেদন করে মানুষ মাসের পর মাস অপেক্ষা করছে, চেম্বার আদালতেও শত শত মামলা আটকে আছে। নিম্ন আদালতের দুর্নীতির চিত্রও আগের মতোই রয়ে গেছে।
ঢাকা মেইল: বিচার বিভাগের এই স্থবিরতার পেছনে মূল কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: সরকার মেগা প্রজেক্টে প্রচুর টাকা খরচ করে, কিন্তু বিচার বিভাগের বাজেটের অবস্থা খুবই করুণ। সুপ্রিম কোর্টে আইনজীবীদের বসার জায়গা নেই, পর্যাপ্ত ভবন নেই। নিম্ন আদালতের অবস্থা আরও খারাপ; অনেক জায়গায় এক এজলাসে দুইজন বিচারককে ভাগাভাগি করে কাজ করতে হয়। শুধু সুন্দর বক্তৃতা দিয়ে পরিবর্তন আসবে না, অবকাঠামো এবং সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন ঘটাতে হবে। এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতেও স্থবিরতা বিরাজ করছে।
ঢাকা মেইল: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ট্রাইব্যুনাল এবং মামলার অগ্রগতি নিয়ে আপনি কি সন্তুষ্ট?
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: মামলার অগ্রগতি একদমই আশানুরূপ নয়। ট্রাইব্যুনাল করা হয়েছিল দ্রুতবিচারের জন্য, কিন্তু এখনো সেটি দৃশ্যমান হচ্ছে না। আমার মনে হয়, সরকার প্রধানের যে সদিচ্ছা বা চিন্তা, তার সঙ্গে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কাজের ধরনে একটা বড় গ্যাপ রয়েছে। তারা এখনো সেই পুরনো ধীরগতির আমলতান্ত্রিক মানসিকতায় রয়ে গেছেন। মানুষ একটি 'রেডিক্যাল চেঞ্জ' বা মৌলিক পরিবর্তন চেয়েছিল, যা এখনো সব পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়নি। তবে আমি আশাবাদী যে সামনের দিনগুলোতে পরিবর্তন আসবে।
ঢাকা মেইল: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ সময় দেওয়ার জন্য।
ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন: আপনাকেও ধন্যবাদ।
বিইউ/জেবি