মহিউদ্দিন রাব্বানি
০৯ মার্চ ২০২৬, ০২:২৮ পিএম
গ্রীষ্মকাল ও বোরো মৌসুম সামনে রেখে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সম্ভাব্য চাহিদা মোকাবিলায় সরকার সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে জ্বালানি আমদানিতে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বিকল্প উপায়ে সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখতে চেষ্টা করছে সরকার। গ্রীষ্মে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের চেষ্টা থাকবে, তবে সেচ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
রোববার (৮ মার্চ) বিদ্যুৎ ভবনে ঢাকা মেইলকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব, জ্বালানি মজুদ, বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিস্থিতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ঢাকা মেইলের নিজস্ব প্রতিবেদক মহিউদ্দিন রাব্বানি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের একটি বড় অংশ নির্ভর করে ওই অঞ্চলের ওপর। বিশেষ করে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ক্ষেত্রে কাতার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। এই এলএনজি পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী হয়ে বাংলাদেশে আসে। একইভাবে বাংলাদেশ যে ক্রুড অয়েল আমদানি করে তার বড় অংশ আসে সৌদি আরামকোর মাধ্যমে, যা একই রুট দিয়ে পরিবাহিত হয়।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক নেই। ফলে জ্বালানি সরবরাহে একটি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমাদের অনেক জ্বালানিবাহী জাহাজ ইতোমধ্যে পথে ছিল। যুদ্ধ পরিস্থিতি না থাকলে সেগুলো স্বাভাবিকভাবে দেশে পৌঁছাত এবং সরবরাহ প্রক্রিয়াও স্বাভাবিক থাকত।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই রুটে কোনো ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হলে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বহু দেশই জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আন্তর্জাতিক বাজারে সেই ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, সামনে বোরো মৌসুম এবং গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই সময় দেশের কৃষি খাতে ব্যাপক সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হয়, পাশাপাশি গরমের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও বাড়ে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত সময়কে কেন্দ্র করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন মূলত এপ্রিল, মে ও জুন মাসকে টার্গেট করে কাজ করছি। এই সময়টিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সম্ভাব্য চাহিদা আমরা আগেই প্রক্ষেপণ করেছি। সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং তাদের প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
অমিত বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি মজুদ, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং পাইপলাইন পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারণ জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।
ধারণা করা হচ্ছে, গ্রীষ্মকালে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৮ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সে অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। তবে কোনো কারণে ঘাটতি দেখা দিলে কৃষি খাত, বিশেষ করে সেচব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোথাও কিছু ঘাটতি দেখা দিলে আমরা অন্য খাতে সমন্বয় করে কৃষকদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করব। কৃষি উৎপাদন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেচ কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয় সেদিকে আমরা বিশেষভাবে নজর দিচ্ছি।
রমজান মাসে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও সরকারের বিশেষ পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ইফতার, সাহরি ও তারাবির সময় যেন বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অমিত বলেন, রমজান মাসে মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে বিদ্যুতের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই ইফতার, সাহরি ও তারাবির সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। রমজান শেষ হওয়ার পর আমাদের মূল অগ্রাধিকার থাকবে কৃষকদের সেচের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
লোডশেডিংয়ের শঙ্কা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি কোনো পূর্বাভাস দিতে চাননি। তবে তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু বিদ্যুৎ বা জ্বালানি খাত নয়, দেশের অর্থনীতির আরও অনেক খাতে এর প্রভাব পড়তে পারে। তখন বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে এবং জনগণকে তা জানানো হবে।
জ্বালানি তেল নিয়ে মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সে বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে জ্বালানি তেল নিয়ে কিছুটা অস্থিরতা দেখা গেছে। অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিমাণ তেল সংগ্রহ করছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা আতঙ্ক তৈরি হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণেও এমনটা হয়েছে। তবে আমরা এটিকে অস্বাভাবিক মনে করছি না।
প্রতিমন্ত্রী জানান, স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক প্রায় ১২ হাজার টন জ্বালানি তেলের চাহিদা থাকে। কিন্তু গত কয়েক দিনে এই চাহিদা বেড়ে ২৪ থেকে ২৫ হাজার টনে পৌঁছেছে, যা মূলত আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত উত্তোলনের ফল।
অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশে আমাদের নির্দিষ্ট স্টোরেজ সক্ষমতা রয়েছে এবং সেই অনুযায়ী আমরা জ্বালানি মজুত করে থাকি। কিন্তু সবাই হঠাৎ করে দ্বিগুণ বা তিনগুণ তেল সংগ্রহ করতে শুরু করলে স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়।
কিছু ব্যক্তি অসৎ উদ্দেশ্যে জ্বালানি তেল মজুত করছেন বলেও অভিযোগ করেন প্রতিমন্ত্রী। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, যখন মানুষ দেখবে দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে, তখন এই আতঙ্ক ধীরে ধীরে কমে যাবে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার শঙ্কা নিয়ে মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ রয়েছে সে প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ইতোমধ্যে জ্বালানির দাম কিছুটা বেড়েছে। বাংলাদেশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় সেই চাপ দেশের বাজারেও পড়বে।
তবে আপাতত সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি বলে জানান তিনি। প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, এই মুহূর্তে জ্বালানির দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। জনগণ অনেক আশা নিয়ে আমাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছে। তাই আমরা চেষ্টা করছি যেন মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।
জ্বালানি তেল মজুতকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে নজরদারি করছে এবং প্রয়োজনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।
তিনি বলেন, যারা অসৎ উদ্দেশে জ্বালানি তেল মজুত করবে তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
এমআর/জেবি