Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়-পরাজয় কীভাবে নির্ধারিত হবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম

প্রেসিডেন্ট পদে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাকি অধ্যায় কীভাবে কাটবে, তা নির্ধারণ করতে আজ মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোট দিতে যাচ্ছেন মার্কিন নাগরিকরা। 

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে সরকারের বিভিন্ন স্তরের হাজার হাজার পদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ। ভোটারদের জন্য মূল আকর্ষণ হবে প্রতিনিধি পরিষদ ও সেনেটের সদস্য নির্বাচন করা, যে দুটি কক্ষ নিয়ে কংগ্রেস গঠিত।

উভয়টিই বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের সাফল্য বা ব্যর্থতা এই নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করতে পারে।

ক্ষমতার লড়াইয়ের জয়-পরাজয় কোথায় নির্ধারিত হবে, তার একটি ধারণা এখানে দেওয়া হলো; জনসমর্থন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং এতে ব্যয় হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ পর্যন্ত সবকিছুই এতে রয়েছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্পের জন্য খারাপ সময়ে এসেছে

বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের কংগ্রেস পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকার অন্যতম কারণ হলো প্রেসিডেন্টের জনসমর্থন কমে আসা, যা তার দল কেমন ফল করতে পারে তার একটি ভালো সূচক।

জনমত জরিপ বিষয়ক ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করেছিলেন ৫০ শতাংশের কিছু বেশি জনসমর্থন নিয়ে, কিন্তু তা দ্রুত ৪০-এর ঘরে নেমে আসে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে ট্রাম্প যখন ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন এটি প্রায় ৪২ শতাংশের কাছাকাছি ছিল, কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তা ৪০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বর্তমানে এটি প্রায় ৩৭ শতাংশে এ দাঁড়িয়েছে।

আট বছর আগে, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের এই পর্যায়ে তার জনসমর্থন ছিল উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, ৪৩ শতাংশ। জো বাইডেনের মেয়াদের একই পর্যায়ে তা ছিল ৪০ শতাংশ। উভয় ক্ষেত্রেই, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালেও সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছিলেন।

কিন্তু ট্রাম্পের দুর্বল জনপ্রিয়তা এটা ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে যে, কেন ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী এবং কেন তারা এমন রাজ্যগুলোর দিকে নজর দিচ্ছে যেগুলোতে রিপাবলিকানরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে জিতে আসছে।

প্রতিনিধি পরিষদের জন্য লড়াই

নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা অত্যন্ত ক্ষীণ। তাদের ২১৮ জন প্রতিনিধি রয়েছেন, যা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সঠিক সংখ্যা, এবং এর সঙ্গে আছেন একজন স্বতন্ত্র সদস্য যিনি তাদের সঙ্গেই ভোট দেন।

প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন, তাই নভেম্বরে ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।

কিন্তু বেশিরভাগ ডিসট্রিক্টকেই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ বলে মনে করা হয় না, কারণ যে দলটির দখলে এই আসনগুলো রয়েছে, তাদের সমর্থন এতটাই সুদৃঢ় যে সম্ভাব্য বিজয়ী কেবল একজনই।

প্রচারণা ও নির্বাচন বিশ্লেষণকারী কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট অনুযায়ী, মাত্র ১৮টি ডিসট্রিক্ট-এ ফলাফল অনিশ্চিত, যেগুলোতে যেকোনো দলই জিততে পারে।

ওই ১৮টি অনিশ্চিত আসনের মধ্যে ১৪টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের।

কিন্তু ডেমোক্র্যাটরা যদি এগুলোর একটিতেও জয়ী না হয়, তবুও ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বা ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে থাকা হিসেবে চিহ্নিত ৩৬টি আসন দখল করতে পারলে তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যাবে।

ঐতিহাসিকভাবে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদে বিপুল সংখ্যক আসনের হাতবদল হয়, যা সাধারণত হোয়াইট হাউজের বিরুদ্ধে একটি প্রতিবাদ হিসেবে ঘটে থাকে।

১৯৩৪ সাল থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের দলের গড় পরাজয়ের সংখ্যা ২৭। এই ২৩টি নির্বাচনের মধ্যে প্রেসিডেন্টের দল মাত্র তিনটিতে জয় লাভ করেছে।

trump1

সেনেটের জন্য লড়াই

সেনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ কিছুটা শক্তিশালী। ১০০টি আসনের মধ্যে তাদের দখলে রয়েছে ৫৩টি আসন, এবং দুজন স্বতন্ত্র সদস্য, যারা তাদের সঙ্গেই ভোট দেন। আর ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৫টি আসন।

সেনেট সদস্যরা ছয় বছরের জন্য দায়িত্ব পালন করেন, তাই প্রতি দুই বছর অন্তর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সদস্য নির্বাচনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।

নভেম্বরে ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, কিন্তু কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে যে, এর মধ্যে মাত্র সাতটি আসনের ফলাফল যেকোনো দিকেই যেতে পারে।

এই অনিশ্চিত আসনগুলোর মধ্যে ছয়টি বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে এবং একটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে রয়েছে।

সেনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং ৫১টি আসনে পৌঁছানোর জন্য ডেমোক্র্যাটদের এই আসনগুলোর মধ্যে চারটি এবং এর সঙ্গে সম্ভাব্য বা ডেমোক্র্যাটিক-ঝোঁকযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত চারটি আসনে জিততে হবে।

কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করা কোনো সহজ কাজ নয়।

মিশিগানে তাদের আসনটি ধরে রাখতে হবে, যেখানে জনমত জরিপ অনুযায়ী বামপন্থি রাজনৈতিক বহিরাগত আব্দুল এল-সায়েদ এবং তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী, ট্রাম্পের মিত্র ও প্রাক্তন এফবিআই এজেন্ট মাইক রজার্সের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডেমোক্র্যাটদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি তীব্র।

এবং ২০২৪ সালে ট্রাম্প যে রাজ্যগুলোয় দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন, যেমন আলাস্কা, আইওয়া এবং ওহাইও, সেখানেও তাদের আসন জিততে হবে।

কিন্তু জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তাদের একটি সুযোগ রয়েছে, এমনকি টেক্সাসেও, যেখানে প্রাক্তন শিক্ষক জেমস টালারিকো বর্তমান অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র কেন প্যাক্সটনকে পরাজিত করতে পারলে ১৯৮৮ সালের পর রাজ্যটিতে সিনেটের আসন জেতা প্রথম ডেমোক্র্যাট হতে পারেন।

ভোটারদের জন্য মূল বিষয় কোনগুলো?

ট্রাম্প তার ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ‘মুদ্রাস্ফীতি বন্ধ করে আমেরিকাকে আবারও সাশ্রয়ী করে তোলার’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কিন্তু জীবনযাত্রার ব্যয় সংকটই ভোটারদের কাছে মূল বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

২৪শে ফেব্রুয়ারি তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করেন যে, ‘অধিকাংশ রাজ্যে গ্যাসের দাম এখন প্রতি গ্যালন ২.৩০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে’।

কিন্তু এর চার দিন পরেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করে এবং যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের দাম ৪ ডলারে পৌঁছে যায়।

যুদ্ধটি ক্রমশ অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ এর পরিণতি বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ভোক্তাদের আর্থিক অবস্থার ওপর আঘাত হানে।

অগাস্টে পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ট্রাম্পের ভূমিকাকে অসমর্থন করেছেন।

ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা এবং অভিবাসন।

ট্রাম্প সম্প্রতি তার অভিবাসন নীতিকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং এর কারণ হিসেবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় সীমান্ত অতিক্রমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

অনেক ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী মার্কিন স্বাস্থ্য বীমার উচ্চ ব্যয় এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকারের ওপর ট্রাম্পের আইনের প্রভাবের ওপর নজর দিয়েছেন।

ট্রাম্প কি রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখতে পারবেন?

বেশিরভাগ লক্ষণই ডেমোক্র্যাটদের জন্য একটি সফল মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু ট্রাম্প ও তার দল যদি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন জেতে, তবে এটিই প্রথমবার হবে না যে তারা জনমত জরিপকে ছাড়িয়ে গেছে।

তাদের অনুকূলে থাকা অল্প কয়েকটি বিষয়ের মধ্যে একটি হলো তাদের বিপুল আর্থিক সুবিধা।

অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে রিপাবলিকান ন্যাশনাল কমিটি এবং এর সহযোগী দলগুলোর হাতে প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ডলার (৩২ কোটি ডলার) নগদ অর্থ ছিল, অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল ২৩০ মিলিয়ন ডলারের (২৩ কোটি ডলার) কিছু কম।

এর পাশাপাশি, রিপাবলিকানদের ১৬০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ ট্রাম্পের ‘এমএজিএ' বা মাগা ইনকর্পোরেটেড গ্রুপের কাছে ছিল, যা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রধান তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়কারী শাখা।

রিপাবলিকানরা সেই আর্থিক সুবিধাকে বিজ্ঞাপন কেনার জন্য ব্যবহার করছে।

গবেষণা সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে মার্কিন ভোটারদের কাছে ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলারেরও বেশি মূল্যের রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল। রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের চেয়ে ২০০ মিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে এবং প্রায় সব অনিশ্চিত সিনেট আসনেই তাদের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করেছে।

ট্রাম্প আশা করবেন যে, শেষ মুহূর্তের এই ব্যাপক প্রচার অভিযান রিপাবলিকানদের নভেম্বরে ভোট দিতে উৎসাহিত করতে সাহায্য করবে, যার ফলে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে এবং তার ও তার দলের ক্ষতি সীমিত হবে।

ফলাফল যাই হোক না কেন, মনোযোগ দ্রুতই ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে ঘুরে যাবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের অজনপ্রিয়তাই প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু সাংবিধানিকভাবে তিনি তৃতীয় মেয়াদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারায়, ডেমোক্র্যাটদের মনোযোগ সরে যাবে তারা কোন বিষয়গুলো পক্ষে, আর কোনগুলো বিপক্ষে থাকবে- সেদিকেই।

সূত্র: বিবিসি

এমএইচআর