আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের ‘মাদার অব অল বম্বস’ (সব বোমার মা) নামে পরিচিত বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বোমার পাল্টা হিসেবে ‘ফাদার অব অল বম্বস’ (সব বোমার বাবা) নামে নতুন একটি অস্ত্র উন্মোচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান।
বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানের বার্তা সংস্থা ইয়াং জার্নালিস্টস ক্লাব (ওয়াইজেসিএনএ)-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানান দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি।
তিনি বলেন, “আমরা ‘ফাদার অব অল বম্বস’ উন্মোচনের প্রস্তুতি পর্যায়ে আছি। এটি শত্রুপক্ষের জন্য নতুন কিছু হতে যাচ্ছে”।
তবে মোহেবি অস্ত্রটির ওজন, বিস্ফোরক উপাদান, পাল্লা, বহনক্ষমতা, লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের পদ্ধতি কিংবা সম্ভাব্য উন্মোচনের তারিখ সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেননি। এমনকি এটি প্রচলিত অর্থে বড় আকারের বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র, নাকি অন্য কোনো ধরনের সামরিক ব্যবস্থা—সেটিও স্পষ্ট করেননি।
আইআরজিসি মুখপাত্র আরও জানান, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র মজুদ দেড় গুণ বেড়েছে। তবে তিনি কোনো নির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দেননি।
তিনি বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর গুণগত মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে এবং সেগুলোর পাল্লা, ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতা বৃদ্ধি পেয়েছে’।
যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে মোহেবি বলেন, ‘আগে ইরানের প্রতিরক্ষা নীতি ছিল পুরোপুরি আত্মরক্ষামূলক। আমরা বলতাম যে, যদি কোনো দেশ আমাদের ওপর হামলা করে, আমরা তার জবাব দেব। এখন আমরা বলছি যে, যদি কোনো দেশ আমাদের ওপর হামলা করে, আমরা শুধু তার জবাবই দেব না, বরং পাল্টা আক্রমণও শুরু করব।’
ইরান যেকোনো হামলার জবাব একই ধরনের ব্যবস্থা নেবে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কৌশল শুধু আক্রমণাত্মক থাকবে না; আমরা শত্রুকে এমনভাবে আক্রমণ করব, যাতে তারা আমাদের প্রতিক্রিয়ার তীব্রতা অনুভব করতে পারে।’
এমওএবি নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের এই বিশেষ বোমাটির আনুষ্ঠানিক নাম জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট। প্রায় ২১ হাজার ৬০০ পাউন্ড বা ৯ হাজার ৮০০ কেজি ওজনের এই বোমাকে মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারের সবচেয়ে বড় অ-পারমাণবিক বোমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এমওএবির বিস্ফোরণে বিশাল এলাকাজুড়ে তীব্র চাপতরঙ্গ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে ভূগর্ভস্থ গভীর স্থাপনা, সুরক্ষিত বাংকার কিংবা শক্তিশালী কংক্রিটের নিচে অবস্থিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করার জন্য এটি তৈরি করা হয়েছে। এ কারণেই বোমাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ‘মাদার অব অল বোম্বস’ নামে পরিচিত।
২০০৩ সালে অস্ত্রটির প্রথমবারের মতো পরীক্ষা করে মার্কিন সেনা বাহিনী।
পরবর্তীতে ২০১৭ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানের নানগারহার প্রদেশে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো এমওএবি ব্যবহার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময় জঙ্গিগোষ্ঠীটির ব্যবহৃত গুহা ও সুড়ঙ্গের একটি নেটওয়ার্ক লক্ষ্য করে বোমাটি নিক্ষেপ করা হয়।
আফগান কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় আইএসের ৩৬ জন যোদ্ধা নিহত হয়েছিলেন। সেই অভিযানের পর থেকে বোমাটি যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী প্রচলিত অস্ত্রগুলোর একটি হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
ইরানের পক্ষ থেকে অস্ত্রটির ওজন, বিস্ফোরক পদার্থের পরিমাণ, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা ধ্বংসের ব্যাসার্ধ প্রকাশ করা হয়নি। কোনো পরীক্ষার তথ্যও এখনো সামনে আসেনি।
তবে ইরানের ভারী প্রচলিত বোমা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে অতীতেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
২০১৭ সালে নিজস্ব প্রযুক্তিতে প্রায় ১০ টন ওজনের একটি বোমা তৈরির দাবি করে ইরান। সে সময় তেহরানের পক্ষ থেকে সেটিকে মার্কিন এমওএবি-এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।
গত ১৫ অক্টেবর মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষে ফের ইরানে হামলা শুরু করতে পারে মার্কিন বাহিনী। পরিকল্পনায় ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো এবং পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি স্থাপনায় হামলার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত একটি ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাও রয়েছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ গভীর ভূগর্ভে সুরক্ষিত অবস্থায় থাকতে পারে। এসব স্থাপনায় হামলার কার্যকারিতা নিয়ে সামরিক পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা ইরানে নতুন করে অভিযান চালানোর বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তুত করছেন। এসব পরিকল্পনার মধ্যে বড় ধরনের হামলার পাশাপাশি তুলনামূলক সীমিত সামরিক পদক্ষেপও থাকতে পারে।
হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা সিএনএনকে জানিয়েছেন, সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে তারা মন্তব্য করেন না। তবে তিনি বলেছেন, ইরান যাতে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট সব বিকল্প খোলা রেখেছেন।
সূত্র: আনাদোলু, রয়টার্স
এমএইচআর