আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৩ পিএম
বাংরাদেশের মতো ভারতে সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা হচ্ছে— দাবি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে দেশটির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন কংগ্রেস নেতা শশী থারুর। তিনি বলেছেন, ‘ভারত বাংলাদেশ নয়, আবার ফ্রান্সও নয়। ফলে এই দুই দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে ভারতের পরিস্থিতির তুলনা করা প্রাসঙ্গিক নয়।’
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে থারুর এসব কথা বলেন।
সম্প্রতি ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদবিষয়ক মন্ত্রী ও বিজেপি নেতা কিরেন রিজিজু অভিযোগ করেন, বিরোধী দলের কয়েকজন নেতা ও কিছু সংগঠন তরুণদের উসকে দিয়ে ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি এবং সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশ ও ফ্রান্সের রাজনৈতিক অস্থিরতার উদাহরণ দিয়েছেন।
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বিরোধী শিবিরের কয়েকজন নেতা ও অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরাসহ অধিকারকর্মীর বক্তব্যকে শেয়ার করে তিনি বলেন, ‘এই লোকগুলোকে দেখুন, শাসন পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। কিন্তু মন দিয়ে শুনুন: ভারত বাংলাদেশ নয়’।
রিজজু আরও লেখেন, ‘ভারতীয় যুবকরা বোকা নয়; তারা ভারতকে গড়বে, ধ্বংস করবে না। প্রকৃত ভারতীয় যুবকরা পদক জিতছে, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্ভাবন, স্টার্টআপ এবং প্রযুক্তিতে পথ দেখাচ্ছে - এবং সাংস্কৃতিক আইকন হয়ে উঠছে’।
পরদিন রোববারও তিনি অভিযোগ করেন, কিছু ‘ভারতবিরোধী’ গোষ্ঠী ও রাজনীতিক তরুণদের উসকে দিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। তবে ভারতে সরকার পরিবর্তন সম্ভব, তবে তা নির্বাচনের মাধ্যমেই হতে হবে।
রিজিজুর বক্তব্যের জবাবে থারুর বলেন, ‘আমি মনে করি, ভারত বাংলাদেশ নয় এবং ভারত ফ্রান্সও নয়। এই তুলনাগুলোকে আমি বিশেষ প্রাসঙ্গিক বলে মনে করি না।’
ফ্রান্সে চলমান সহিংসতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাসে আগুন দেওয়া কিংবা পুলিশ স্টেশনে হামলার মতো কোনো সহিংসতাকে বিরোধীরা সমর্থন করবে না। আমাদের অবস্থান শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পক্ষে’।
থারুর আরও বলেন, ‘বিরোধীদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা ক্ষমতাসীন সরকারকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করাই আমাদের মূল দাবি’।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের পরিচালিত বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন (এসআইআর) কর্মসূচি নিয়ে দেশটিতে প্রায় এক মাস ধরে আন্দোলন করে যাচ্ছে কংগ্রেস নেতৃত্বধীন বিরোধী ইন্ডিয়া জোট ও তরুণদের প্রতিবাদি প্লার্টঢর্ম ককরোচ জনাতা পার্টি (সিজেপি)।
বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং পুরো কার্যক্রমে অনিয়ম হয়েছে।
থারুর দাবি করেন, ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়া উদ্বেগজনক। সংশোধন প্রক্রিয়াটি সমস্যাপূর্ণ, অনিয়মিত এবং আংশিকভাবে বেআইনি।
এই কংগ্রেস নেতা বলেন, এই প্রক্রিয়ায় যেসব অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো সংশোধনের দাবি জানাচ্ছে বিরোধীরা। বিষয়টি সংবিধান ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত; সরকার উৎখাতের প্রচেষ্টা হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনা ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে পাঠানো এক ভিডিওবার্তায় বাংলাদেশের আন্দোলনের প্রশংসা করেন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) সভাপতি নেহা বোরা।
ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, ‘ভারতজুড়ে এখন যে জেন-জি আন্দোলন চলছে, তা মূলত শুরু হয়েছে বাংলাদেশকে দেখে। আমাদেরকে পথ দেখানোর জন্য ও ভারতের তরুণ সমাজের প্রতি সমর্থন জুগিয়ে যাওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ। আমরা জানি, বাংলাদেশে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল তা ছিল, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনার লড়াই। বর্তমানে ভারতে যে বিক্ষোভ চলছে, তার উদ্দেশ্যেও এক’।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের পক্ষ থেকেও একই ধরণের অভিযোগ উঠেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টেবর) উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং অভিযোগ করেছেন, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আদলে ভারতে সরকার পতনের চেষ্টা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, কংগ্রেস ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা তরুণদের শক্তিকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না করে রাজনৈতিক সংঘাত ও বিশৃঙ্খলা ছড়ানোর কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। চলমান এই আন্দোলন শুধু নির্বাচন কমিশন কিংবা ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে নয়; বরং এর পেছনে সরকার পরিবর্তনের বৃহত্তর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।
রাজনাথ সিং বলেন, ‘দেশের যুবসমাজকে ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কেউ কেউ বাংলাদেশের ঘটনার আদলে শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চাইছে—খোলাখুলিভাবে স্বীকার করছে যে তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতি থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছে; অন্যরা নির্লজ্জভাবে সরকার পতনের ডাক দিচ্ছে। এতে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করা এবং দেশকে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া।’
তবে থারুর এই তুলনাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ভারতের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিস্থিতিকে অন্য দেশের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। বিরোধীদের দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ভোটার তালিকা ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রশ্নকে সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয় বলে মনে করেন তিনি।
সূত্র: এনডিটিভি, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এমএইচআর