Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

ফিলিস্তিনে বর্বরতা চালানো ইসরায়েলকে এবার থামতে বলল চীন

বিশেষ প্রতিনিধি

১৮ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৪৫ এএম

যুগের পর যুগ ধরে অসহায় ফিলিস্তিনিদের ওপর বর্বরতা চালানো ইসরায়েলকে এবার প্রকাশ্যেই হুমকি দিল চীন।

দখলদার ইসরায়েলকে চীন বলেছে অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় জবরদস্তি করে অবৈধ ইহুদি বসিত স্থাপন বন্ধ করতে হবে এবং দীর্ঘদিনের এই নীতি তাদেরকে বদলাতে হবে। 

বেইজিং দৃঢ়ভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, ফিলিস্তিন সংকটের একমাত্র ও সঠিক রাজনৈতিক সমাধান হলো একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা

ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হেরজগের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) মুখোমুখি এক বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াং ই শক্তভাবে এই দাবী করেন।

গাজা উপত্যকায় সর্বাত্মক মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পথ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করারও আহ্বান জানিয়েছে চীন, যাতে চলমান মানবিক বিপর্যয় আরও ছড়িয়ে পড়তে না পারে।

গত জুলাই মাসে- হামাস, ফাতাহ্ এবং অন্যান্য প্রায় এক ডজন ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী মিলে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে একটি অস্থায়ী চুক্তি স্বাক্ষর করে। 

গাজার যুদ্ধ শেষে সেখানকার প্রশাসনের জন্য একটি "জাতীয় পুনর্মিলনের অন্তর্বর্তী সরকার" গঠনের লক্ষ্যে ওই চুক্তি হয়েছিল। এই গোষ্ঠীগুলো একই ধরনের চুক্তির জন্য গত ফেব্রুয়ারিতে মস্কোতেও বৈঠক করেছিল।

সে সময় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী মন্তব্য করেন, ফিলিস্তিনিদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যে অন্যায়- অবিচার চলছে তা এই শতকের সবচেয়ে বড় অবিচার। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে চীনে সমর্থনের কথাও ইসরায়েলি প্রেসিডেন্টের কাছে তুলে ধরেন ওয়াং ই। 

আজারবাইজানে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে ওই বৈঠকটি হয়। ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে নিয়ে চীন সম্ভবত এই প্রথম এমন প্রকাশ্যে এত শক্ত ভাষায় ইসরায়েলের সঙ্গে কথা বললো।

প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো, বেইজিং বা মস্কো কেউই হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বিবেচনা করে না। তাই হামাসকে সংলাপে আমন্ত্রণ জানাতে কোনও সমস্যা নেই চীন ও রাশিয়ার।

তবে এই ধরনের মধ্যস্থতায় কোনও বাস্তব ফলাফল হবে কি? বিশেষজ্ঞরা অবশ্য সেটা সম্ভব নয় বলেই মনে করেন। তবে এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, চীন ও রাশিয়া এই হস্তক্ষেপের মাধ্যমে কী করতে চাইছে?

এক্ষেত্রে তাদের দু’টি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে, আন্তর্জাতিক প্রভাব অর্জন এবং বিশ্বে আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তিকে প্রতিহত করা।

ইতিহাস বলছে, ১৯৪৯ সালে আধুনিক গণপ্রজাতন্ত্রী চীন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এশিয়ায় প্রভাবশালী এই দেশটি ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

চীনের প্রতিষ্ঠাতা, মাও শেতোং ইসরায়েলকে ঠিক একইভাবে দেখেছিলেন, যেভাবে তিনি তাইওয়ানকে দেখেছিলেন। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের ঘাঁটি হিসেবে এবং ওয়াশিংটন কর্তৃক আরোপিত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সম্ভাব্য সমালোচকদের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রতিষ্ঠিত।

মাও শেতোং এর সমর্থন অবশ্য কেবল বক্তব্যেই থেমে থাকেনি। মাও, যিনি সারা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন, প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও)-এর কাছে অস্ত্র পাঠিয়েছিলেন এবং তাদের চিন্তাধারায়ও ব্যাপক প্রভাব রেখেছিলেন।

চীনের সঙ্গে ইসরায়েলের এই বর্বরতার প্রতিবাদ জানাচ্ছে রাশিয়াও। ফিলিস্তিনের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক শুরু হয় একটু ভিন্নভাবে। 

যখন ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল তার স্বাধীনতা ঘোষণা করে, তখন জোসেফ স্ট্যালিনের অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এটিকে স্বীকৃতি দেয়া বিশ্বের প্রথম দেশগুলির মধ্যে একটি ছিল।

জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতির ইমেরিটাস অধ্যাপক মার্ক কাটজ বিবিসিকে বলেছেন, "সেই সময় মনে হচ্ছিল ইসরায়েলের সমাজতান্ত্রিক ঝোঁক ছিল, যখন সব প্রতিবেশী দেশ ইউরোপীয় উপনিবেশ ছিল।"

তবে, ইসরায়েল একটি সমাজতান্ত্রিক দেশে পরিণত হয়নি এবং ১৯৫০-এর দশকের মাঝামাঝি, সাবেক সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ আরব জাতীয়তাবাদের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন।

"ফিলিস্তিনের স্বার্থ দেখা মস্কোর জন্য খুব দরকার ছিল কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ইসরায়েলকে সমর্থন করেছিল, তখন সোভিয়েতরা ফিলিস্তিনিদের সমর্থন করায় আরব দেশগুলির মধ্যে আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠছিল," বলেন অধ্যাপক কাটজ।

কিন্তু ফিলিস্তিনের স্বার্থ রক্ষা আরব বিশ্বের অনেকের কাছে নীতিগত বিষয় হলেও, মস্কোর জন্য এটি ছিল কেবলই একটা সুবিধা নেয়ার বিষয়।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের সঙ্গে সঙ্গে, ইসরায়েলের প্রতি রাশিয়া নমনীয় হতে শুরু করে এবং রুশ ইহুদিদের অভিবাসন থেকে বিরত রাখার নীতিগুলি শিথিল করা হয়। 

ভ্লাদিমির পুতিন ২০০০ সালে যখন রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি হন, ইতিমধ্যেই ১০ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি সোভিয়েত ঐতিহ্যকে ধারণ করেছিল, যাদের মধ্যে অনেকেই রুশ ভাষায় কথা বলত।

ক্রেমলিন তখন থেকে ইসরায়েলের সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।

china

সম্প্রতি অবশ্য ইসরায়েলি সরকারের সঙ্গে এই সম্পর্ক বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে, যা আরও শীতল হয়েছে গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে, যেদিন ইসরায়েলের ওপর হামাস আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে ১২শ’র বেশি লোককে হত্যা করে এবং ২৫১জনকে জিম্মি করে।

ইসরায়েল এই হামলার জবাবে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে।

চীন ইতিমধ্যেই বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক হয়ে উঠেছে, দেশটিতে তেলের আনুমানিক অর্ধেকই মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরের দেশগুলি থেকে আসে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতে মধ্যস্থতা করার প্রচেষ্টা মূলত চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের প্রভাব বাড়ানোর কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইসরায়েলের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্প্রতি এ বৈঠক হল। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে মিসর সফরকালে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পুনর্গঠনের পাশাপাশি বহিরাগত প্রভাব প্রতিরোধের তাগিদ দেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। 

ইরানের সঙ্গে বড় বাণিজ্য সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রক্ষা করে চলছে চীন। 

-এমএমএস