আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৭ এএম
সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং তুরস্ক সোমবার (৫ সেপ্টেম্বর) ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’-এর আওতায় যৌথ প্রতিরক্ষার প্রতিশ্রুতিগুলো অবিলম্বে বাস্তবায়নের বিষয়ে সম্মত হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে হুথিদের হুমকির মুখে থাকা সৌদি আরবে যৌথ সামরিক বাহিনী মোতায়েন ও অন্যান্য সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি করা। খবর আল-জাজিরা ও আরব নিউজের।
ইরান ও তার মদদপুষ্ট বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে সৌদি আরব যেসব নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে রিয়াদে জোটের ‘কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষা কমিটি’র এক জরুরি বৈঠকের পর এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা মোকাবিলায় মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা সক্রিয় ও সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েন করতে সম্মত হয়েছে তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরব।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে সোমবার এ তিন দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক জরুরি বৈঠক শেষে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। গত ৭ আগস্ট ‘মক্কা ডিফেন্স অ্যালায়েন্স’ বা ‘মক্কা প্রতিরক্ষা জোট’ নামের এ চুক্তি সই হওয়ার পর এই প্রথম এটির কার্যকারিতা শুরু হলো।
চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর হামলা হলে তা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন সনদের একটি মূলধারার সঙ্গে এ চুক্তির হুবহু মিল রয়েছে।
হুতিদের গত মাসে দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী একটি পাল্টা অভিযান শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ঘোষণা এল।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান জানান, ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের হামলা এবং এর পেছনে যারা জড়িত, তাদের জবাব দিতে এ জোটের আওতায় ‘সম্মিলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা’ সক্রিয় করার বিষয়ে কমিটি একমত হয়েছে।
খালিদ বিন সালমান আরও বলেন, এ জোট সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হওয়া হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আবারও দৃঢ় করেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত একটি আলাদা বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ তিন দেশ চুক্তি অনুযায়ী তাদের পূর্বনির্ধারিত সামরিক শক্তি ও সক্ষমতার জোগান দেবে এবং সৌদি আরবে তাদের দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করবে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, অঙ্গীকারগুলো অনুমোদিত চুক্তি ও প্রতিটি দেশের নিজস্ব আইন মেনেই বাস্তবায়ন করা হবে।
হুতিদের গত মাসে দখল করা এলাকাগুলো পুনর্দখলে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী একটি পাল্টা অভিযান শুরু করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এ ঘোষণা এল।
সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে, তারা লোহিত সাগরের বন্দরনগরী মোখা পুনর্দখল করেছে ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এখন তাদের হাতে।
এ জোট সৌদি আরব এবং পবিত্র স্থানগুলোর ওপর হওয়া হামলা মোকাবিলায় তিন দেশের সংহতি ও ঐক্য আবারও দৃঢ় করেছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর চলতি অভিযানে নিজেদের অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। তাদের ১০০টি যুদ্ধবিমান এ অভিযানে সহায়তা দিচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
এদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও উপকূলীয় শহর রাবিগের আরামকো তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর দাবি করেছে হুতিরা। গোষ্ঠীটি আরও দাবি করেছে যে তারা একটি বিমানবন্দর, একটি বিমানঘাঁটিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে।
তবে হুতিদের এ দাবির বিষয়ে রিয়াদের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চয়তা কিংবা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধকে কেন্দ্র করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তীব্র হতে থাকা সংঘাতের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই মূলত মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে।
গত আগস্টে এ জোটের প্রতিরক্ষা চুক্তি সই হয়। এর কিছুদিন পরই ইয়েমেনে হুতিরা তাদের অভিযান শুরু করে। পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে থাকে।
২০২৬ সালের গ্লোবাল ফায়ারপাওয়ার ইনডেক্স অনুযায়ী, এ জোটের তিন সদস্য দেশের সম্মিলিত সক্রিয় সেনা সদস্যের সংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। এ ছাড়া তাদের রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ সামরিক বিমান, ৬ হাজার ট্যাংক ও ৩৪০টিরও বেশি নৌযুদ্ধের সরঞ্জাম।
শুরুর দিকে এ চুক্তিতে প্রতিটি দেশের সামরিক দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তেমন প্রকাশ করা হয়নি। তবে পরবর্তী সময়ে জোটটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে সৌদি আরবের দিকে হুতিরা ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছিলেন, সৌদি আরবের ওপর কোনো হামলা হলে এই চুক্তি কার্যকর হতে পারে।
পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজকে খাজা আসিফ তখন বলেছিলেন, ‘যদি কোনো উসকানি ছাড়াই আগ্রাসন চালানো হয় কিংবা ইয়েমেনে যা ঘটছে তার আঁচ সৌদি আরবে এসে পড়ে, তবে মক্কা চুক্তি অবশ্যই কার্যকর হবে।’ অবশ্য গতকালের আগপর্যন্ত এ জোট কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের জ্যেষ্ঠ নন-রেসিডেন্ট ফেলো আবদুল আজিজ আলঘাশিয়ান বলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি সক্রিয় করার এ সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
আল-জাজিরাকে আলঘাশিয়ান বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহ ও মাসগুলোতে হুতিদের হামলা এবং উসকানি মূলত মক্কা জোটের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে।
এমনকি এটিকে অনুপ্রাণিতও করেছে। হামলাগুলো জোটের সাংগঠনিক কাঠামোকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আলঘাশিয়ান আরও বলেন, এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে ওঠার আভাসও পাওয়া যাচ্ছে। তার ভাষায়, আমরা প্রায়ই আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর কথা বলি, যা শুনতে বেশ চমৎকার লাগে। কিন্তু অনেক সময়ই এটি ফাঁপা শোনায় এবং এর বিস্তারিত অর্থ অনেকে বোঝেন না।
তবে আমার মনে হয়, এখন আমরা এটি বাস্তবে রূপ নিতে দেখছি। এই অঞ্চলের ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ।
-এমএমএস