Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

থাইল্যান্ডের মুসলিমদের ৬ দশকের সংগ্রাম কি এবার সফল হবে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৪৭ পিএম

থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের মুসলিম-অধ্যুষিত তিন প্রদেশ পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াত— প্রায় ছয় দশক ধরে দেশটির সবচেয়ে জটিল রাজনৈতিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। মালয়-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই অঞ্চলে কয়েক দশক ধরে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও সহিংসতা চলছে। 

সম্প্রতি দেশটির প্রধান বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (বিআরএন) জানিয়েছে, একটি স্বাধীন ইসলামিক দেশ গঠন ও তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে—ছয় দশকেরও বেশি সময়ের এই সংঘাত কি স্বাধীনতার দিকে যাবে, নাকি থাইল্যান্ডের ভেতরেই কোনো রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছাবে?

কেন শুরু হয়েছিল এই সংঘাত?

 

দক্ষিণ থাইল্যান্ডের (তৎকালীন সিয়াম) বর্তমান পাত্তানি, ইয়ালা ও নারাথিওয়াতসহ আশপাশের এলাকা ঐতিহাসিকভাবে ‘পাটানি’ নামে পরিচিত একটি মালয়-মুসলিম সুলতানাতের অংশ ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের একটি গবেষণা অনুযায়ী, ১৯০২ সালে পাটানির শেষ সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং ১৯০৯ সালের অ্যাংলো-সিয়ামিজ চুক্তির মাধ্যমে বর্তমান আধুনিক থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্ত নির্ধারিত হলে ঐতিহাসিক পাটানি অঞ্চল দুই দেশের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়।

এই অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ জাতিগতভাবে মালয় এবং মুসলিম। তারা স্থানীয় মালয় ভাষার একটি রূপ, ‘জাভি’ ব্যবহার করে এবং তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থাইল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ জনগোষ্ঠী থেকে আলাদা। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসনিক একীকরণ, থাই ভাষা ও সংস্কৃতির প্রাধান্য এবং স্থানীয় মালয় ভাষা ও পরিচয়ের প্রশ্নে অসন্তোষ তৈরি হয়। 

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইআরডব্লিউ) ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ১৯০২ সালে থাইল্যান্ডের সঙ্গে সংযুক্তির পর থেকেই স্থানীয় ধর্ম, জাতিগত পরিচয়, ভাষা ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনই পরবর্তী বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির অন্যতম ভিত্তি তৈরি করে।

সেই ভিত্তিতেই ১৯৬০-এর দশকে একাধিক মালয়-মুসলিম রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সংগঠন গড়ে ওঠে। ১৯৫৯ সালে পাটানি ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (বিএনপিপি) এবং পরবর্তী সময়ে ‘বারিসান রেভোলুসি ন্যাশনাল’ (বিআরএন), পাটানি ইউনাইটেড লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিইউএলও)-সহ বিভিন্ন সংগঠন স্বাধীন বা স্বশাসিত পাটানি রাষ্ট্রের দাবিতে সক্রিয় হয়। বিআরএন পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনগুলোর একটিতে পরিণত হয়।

thai

 

২০০৪ সালে কেন সংঘাত নতুন করে তীব্র হলো?

বর্তমান সংঘাতের সবচেয়ে সহিংস অধ্যায় শুরু হয় ২০০৪ সালে। ওই বছর নারাথিওয়াতের একটি সেনা শিবির থেকে শত শত অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটে। এর পর দক্ষিণাঞ্চলে হামলা, বোমা বিস্ফোরণ, অগ্নিসংযোগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ দ্রুত বাড়তে থাকে।

পর্যবেক্ষক সংস্থা ডিপ সাউথ ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালে বিদ্রোহ নতুন করে তীব্র হওয়ার পর থেকে গত দুই দশকে দক্ষিণাঞ্চলে সহিংসতায় ৭ হাজার ৮০০জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য এবং বিদ্রোহীরা রয়েছেন।

থাইল্যান্ডের সরকারি তথ্যভিত্তিক পরিসংখ্যানেও সংঘাতের ব্যাপক মানবিক ক্ষতির চিত্র পাওয়া যায়। এতে ২০০৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০ হাজারের বেশি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনা এবং প্রায় ৬ হাজার মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

বিআরএন আসলে কী চায়?

সম্প্রতি বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিআরএন শান্তি-আলোচনা প্রতিনিধিদলের মুখপাত্র নিকমাতুল্লাহ সিরি বলেন, তাদের মূল লক্ষ্য স্বাধীনতা এবং লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।

মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরের একটি হোটেলে বিআরএন-এর মুখপাত্র বলেন, ‘যতদিন না আমাদের লক্ষ্য (আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন) অর্জিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত লড়াই থামাবেন না। প্রয়োজনে এই সংগ্রাম কেয়ামত পর্যন্ত চলবে।’

thailand
বিআরএন মুখপাত্র নিকামাতুল্লাহ সেরি

তবে সংগঠনটির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। 

সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা আরএসআএস-এর বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিআরএন প্রথমবারের মতো তাদের কাঙ্ক্ষিত থাইল্যান্ডের ভেতরে স্বশাসন, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং মালয়-মুসলিম পরিচয়ের সুরক্ষার একটি কাঠামো উপস্থাপন করে। অর্থাৎ, আলোচনার টেবিলে স্বাধীনতার পাশাপাশি থাইল্যান্ডের ভেতরে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের ধারণাও এসেছে।

এ কারণে বিআরএন-এর বর্তমান অবস্থান শুধু ‘স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা’ নয়। একদিকে সংগঠনের প্রতিনিধিরা স্বাধীনতার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করছেন, অন্যদিকে শান্তি প্রক্রিয়ায় স্বশাসন ও ক্ষমতা ভাগাভাগির কাঠামোও আলোচনায় রয়েছে।

শান্তি আলোচনা 

থাইল্যান্ড সরকার ও বিআরএন-এর মধ্যে মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনা শুরু হয় ২০১৩ সালে। তবে কয়েক দফা আলোচনার পরও স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়নি। বৈঠক হয়েছে, প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

থাইল্যান্ডের প্রধান আলোচক থানুত সুওয়ানানন্দা বলেছেন, শুধু সহিংসতা কমানোর বিনিময়ে সাময়িক ছাড় নয়, বরং সংঘাতের রাজনৈতিক মূল কারণগুলো নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। 

থাইল্যান্ড সরকার ও বিআরএন-এর মধ্যে সর্বশেষ উচ্চ-পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল গত ডিসেম্বরে।

তবে গত জুলাইয়ে পাঁচজন থাই সেনা নিহত হওয়ার একটি হামলার পর আলোচনা স্থগিত হয়। এছাড়াও আগস্টে দক্ষিণাঞ্চলের চারটি প্রদেশে কয়েক ডজন অগ্নিসংযোগ ও বিস্ফোরণের ঘটনাও পরিস্থিতিকে জটিল করে। 

এদিকে সাম্প্রতিক সহিংসতা বৃদ্ধির ঘটনায় বিআরএন-এর দায় স্বীকার বা অস্বীকার করেননি নিকমাতুল্লাহ। 

তিনি জানান, বিআরএন ওই অঞ্চলে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি প্রস্তাব দিয়েছে এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে সংগঠনটি নির্বাচন ছাড়াই ক্ষমতা গ্রহণ করবে।

নিকমাতুল্লাহ বলেন, তারা প্রথমে ৫ থেকে ১০ বছর অঞ্চলটি শাসন করতে চায়। এই সময়ে সেখানে শরিয়াহ পুলিশ এবং ইসলামী আইন অনুসরণকারী আদালত থাকবে, যা শুধুমাত্র মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এরপর গণতান্ত্রিকভাবে জনগণ তাদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা বেছে নেবে।

স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা কতটুকু?

বিশ্লেষকরা বলছেন, স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এখনো বিআরএন-এর ঘোষিত রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার একটি অংশ হলেও বাস্তবে এর পথে বড় বাধা রয়েছে। 

প্রথমত, থাইল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার দেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো বিচ্ছিন্নতাকে সহজে মেনে নেবে—এমন কোনো ইঙ্গিত বর্তমানে নেই।

দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বাধীন পাটানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যাপক সমর্থনের কোনো দৃশ্যমান কাঠামো নেই। তৃতীয়ত, দীর্ঘ সংঘাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে, মালয়েশিয়ার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিকভাবে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চল মালয়েশিয়ার সীমান্তের কাছে এবং অতীতে শান্তি আলোচনায় কুয়ালালামপুর মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। ২০২৬ সালে নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তিনটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক পথ নিয়ে আলোচনা করা যায়—স্বাধীনতার দাবি অব্যাহত রেখে সশস্ত্র সংঘাত, থাইল্যান্ডের ভেতরে ব্যাপক স্বায়ত্তশাসনের ব্যবস্থা, অথবা ধাপে ধাপে ক্ষমতা ভাগাভাগি ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়িয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো।

তবে কোন পথ বাস্তবে গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে ব্যাংকক, বিআরএন, স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং মধ্যস্থতাকারী পক্ষগুলোর আলোচনার ওপর।

সূত্র: রয়টার্সআলজাজিরা, এইচআরডব্লিউ

এমএইচআর