আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৬ পিএম
একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশ আজ ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ১,০০২ জনে পৌঁছেছে। রোগীর উপচে পড়া ভিড়, জরুরি চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র সংকট এবং প্রতিদিন হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় হিমশিম খাচ্ছে দেশের হাসপাতালগুলো।
বুধবার (৮ সেপ্টম্বর) এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলাকালীন রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও এই দীর্ঘমেয়াদী প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং টিকার সরবরাহে তৈরি হয়েছে চরম ঘাটতি। এতে বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়সই হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন বয়সীদের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে।
আরও পড়ুন
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে নতুন করে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু হয়েছে ১০০২ জনের, যার মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল তদারকি, অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং টিকার ক্রয়নীতিতে পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন, যা টিকার প্রাপ্যতা ব্যাহত করেছে এবং বহু শিশুকে এই অত্যন্ত সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অরক্ষিত রেখে দিয়েছে।
গত সোমবার সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, ক্রয়নীতি বদলানোর কারণেই বাজারে টিকার চরম সংকট তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় আরও বেশি শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও টিকাদানের এই ঘাটতিকে প্রাদুর্ভাবের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
ডব্লিউএইচও বলছে, গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িক পতন ছাড়া অধিকাংশ সময় দেশটিতে হাম টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল—যা হাম নির্মূলে ডব্লিউএইচওর সুপারিশকৃত মাত্রা।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতি তৈরি হওয়ায় হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ।
তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে, বাংলাদেশে হামে এত বেশি শিশুর মৃত্যু আগে কখনো হয়নি। এক বছরে এত বিপুল সংখ্যক রোগীও আমরা কখনো দেখিনি। এটি সত্যিই একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি, এবং সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, ভুক্তভোগীরা শিশু।’
সাবেক এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে অবিলম্বে বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা, টিকাদান বৃদ্ধি এবং জোরদার জনসচেতনতা তৈরির কোনো বিকল্প নেই।
হাম আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এরমধ্যেই আকস্মিকভাবে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবারও ডেঙ্গুতে নয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন—চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর দিক থেকে সর্বোচ্চ।
ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, ‘যেন রোগীর ঢল নেমেছে, সবাইকে জায়গা দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে, অনেককেই মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশুদের হামজনিত উপসর্গ উপশমে সহায়ক পেডিয়াট্রিক স্যালাইনের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই চিকিৎসক আরও জানান, বর্তমানে হাসপাতালটির ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৩৫০ রোগী। কিন্তু বর্তমানে সেখানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।
এদিকে হামের প্রাদুর্ভাব অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে চলা এবং বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার ১৩ মাস বয়সী ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও প্রথমে ছেলের জন্য শয্যা পাননি তিনি। পরে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়। ১০ দিন চিকিৎসার পর ছেলেকে বাড়িতে নেওয়া হলেও এখনও তার বারবার জ্বর আসছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেনি।
নাসিমা আরও জানান, অসুস্থ থাকায় তার ছেলে নির্ধারিত সময়ে হাম টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে তাকে জানানো হয়, তখন টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তার চার বড় সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি ও হামের মতো অন্যান্য উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর মেয়েকে নিয়ে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় পরিবারটিকে। শেষ পর্যন্ত তারা হাম রোগীদের জন্য নির্ধারিত একটি হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা ও রোগ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেন।
রিপন বলেন, ‘আমরা শুধু এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছি। কিন্তু সঠিক তথ্যই পাচ্ছি না।’
উল্লেখ্য, হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এতে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ে টিকা পায়নি, তাদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কর্মসূচিও প্রয়োজন।
সূত্র: রয়টার্স
এমএইচআর