Dhaka Mail Logo

আন্তর্জাতিক

দেশবাসীকে যুদ্ধের জন্য তৈরি থাকতে বলল চীন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৩৮ এএম

চলতি বছরের ১ অক্টোবর থেকে সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন চালু করবেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। 

ফলে আমজনতা ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সামরিক কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে আর কোনও বাধা থাকবে না বেইজিংয়ের।

আমজনতা থেকে শুরু করে শিল্প সংস্থা। কৃত্রিম মেধা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) হোক বা সাইবার নিরাপত্তা। আচমকাই দেশসুদ্ধ সবাইকে ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি’ নেওয়ার নির্দেশ দিল চীন! 

সেই লক্ষ্যে বলবৎ হতে চলেছে নতুন প্রতিরক্ষা আইন। লাদাখ, অরুণাচল প্রদেশ নাকি তাইওয়ান (রিপাবলিক অফ চায়না), প্রথমে কাকে নিশানা করবে চীন? এই নিয়ে জল্পনা তীব্র হচ্ছে। উদ্বেগ বাড়ছে নয়াদিল্লিরও।

২০১০ সালে চীনা পার্লামেন্ট ‘ন্যাশনাল পিপল্‌স কংগ্রেসে’ (এনপিসি) পাশ হয় জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন (ন্যাশনাল ডিফেন্স মোবিলাইজেশন ল’)। 

যদিও ‘গ্রাউন্ড জিরো’য় একে কখনওই সেভাবে চালু করেনি বেইজিং। চলতি বছরের ২৮ অগস্ট সংশ্লিষ্ট আইনটির প্রথম বড় সংশোধনীতে পড়ে সিলমোহর। এর পরই, আগামী ১ অক্টোবর থেকে সেটি কার্যকর করার নির্দেশ দেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

সংশোধনের সময় আইনটির ১৪ নম্বর অধ্যায় অপরিবর্তিত রাখে চীনা পার্লামেন্ট এনপিসি। তবে সম্প্রসারিত হয়েছে ৭২ থেকে ৮২ নম্বর ধারা। ফলে জাতীয় প্রতিরক্ষায় বেসামরিক সম্পদ, শিল্প, প্রযুক্তি, তথ্য এমনকি আমজনতাকে যুক্ত করার ক্ষেত্রেও প্রেসিডেন্ট শি-র সামনে আর কোনও আইনগত বাধা রইল না। আর তাই এই আইন চালু হওয়াকে বেইজিয়ের যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবেই দেখছে সামরিক বিশেষজ্ঞ মহল।

অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসারদের দাবি, সংশোধিত জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতির নিয়মাবলি চীনের সৈন্য সমাবেশের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করবে। 

শুধু তা-ই নয়, সংশ্লিষ্ট আইনে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য, ভুখণ্ডগত অখণ্ডতা এবং নিরাপত্তার উপর জোর দিয়েছে বেইজিং। 

তা ছাড়া, এতে প্রচলিত সামরিক প্রস্তুতির পাশাপাশি আর্থিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত স্বার্থ, বৈদেশিক সম্পদের সুরক্ষা এবং অন্য কৌশলগত বিষয়গুলিকেও অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে।

চীনের এই আইনকে যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসাবে দেখার নেপথ্যে একাধিক কারণ রয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের কথায়, বেইজিং খুব ভালো করেই জানে আজকের দুনিয়ায় লড়াই শুধুমাত্র রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ থাকে না। 

সংঘর্ষ শুরু হলেই তাদের ঘাড়ে আসতে পারে বিপুল নিষেধাজ্ঞার চাপ। পাশাপাশি, শত্রুপক্ষের সাইবার হামলা বা হাতিয়ারে কৃত্রিম মেধার ব্যাপক ব্যবহারও বিচিত্র নয়। সেই সব আশঙ্কা মাথায় রেখেই আইন সংশোধন করেছেন প্রেসিডেন্ট শি।

পর্যবেক্ষক মহলের অনুমান, ২০২২ সাল থেকে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন এবং এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া ইরান বনাম আমেরিকা ও ইসরায়েল যুদ্ধের উপর খুব ভালো ভাবে নজরদারি চালিয়েছে চীন।

কেন ‘সুপার পাওয়ার’ হওয়া সত্ত্বেও মস্কো বা ওয়াশিংটন কাঙ্ক্ষিত জয় পাচ্ছে না, তা একরকম বুঝে নিয়েছে বেইজিং। লড়াইতে নেমে ক্রেমলিন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো ভুল করতে নারাজ জিনপিং। তাই এই আইন সংশোধন।

পূর্ব ইউরোপ থেকে পশ্চিম এশিয়া, দু’টি রণাঙ্গনেই টেলিযোগাযোগ, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্য সরবরাহ, বহু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করেছে যুদ্ধের গতি। পাশাপাশি, কখনও ভুয়া খবর ছড়াতে, কখনও আবার দেশবাসীর মনোবল বৃদ্ধিতে প্রয়োজন মতো ব্যবহৃত হয়েছে গণমাধ্যমও। সংশোধিত আইনে এই সমস্ত বেসামরিক ক্ষেত্রের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট জিনপিং, যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

এ ছাড়া ১ অক্টোবর থেকে কৃত্রিম মেধা, এআই ডেটা সেন্টার, বেসামরিক ড্রোন এবং রোবটের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির উপরেও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাবে চীনা প্রশাসন। 

ওই তারিখ থেকে জাতীয় জরুরি অবস্থার মতো সামরিক সমন্বয় রেখে পরিচালিত হবে টেলিযোগাযোগ, কৃত্রিম মেধার তথ্যভান্ডার, সমস্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং গণমাধ্যম। ফলে সংশ্লিষ্ট আইনের সংশোধনী যে নজিরবিহীন, তা বলাই বাহুল্য।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, নতুন আইনে শিল্প সংস্থাগুলির উপর কঠোর বিধিনিষেধ জারির সুযোগ পাচ্ছেন জিনপিং। ফলে জরুরি ভিত্তিতে যে কোনও সংস্থাকে সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে বাধ্য করতে পারবে তার সরকার। পাশাপাশি, কৃত্রিম মেধা, ড্রোন, রোবটিক্স এবং উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের যুদ্ধের প্রস্তুতির নির্দেশ দেওয়াতেও কোনও বাধা নেই বেজিঙের।

বিশেষজ্ঞদের অনুমান, জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইন সংশোধনের মাধ্যমে হাতিয়ার ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের সামরিক ও বেসামরিক উৎপাদনের মধ্যে ব্যবধান কমাতে চাইছেন প্রেসিডেন্ট শি। 

যুদ্ধের সময় চীনা লালফৌজকে অস্ত্র ও গোলা-বারুদ সরবরাহে যাতে কোনও সমস্যা না হয়, তাই কি এই ব্যবস্থা? বেইজিংয়ের অভিসন্ধি ঘিরে ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে সেই রহস্য।

চীনের জাতীয় প্রতিরক্ষা সংহতি আইনের সংশোধনীতে আরও একটি কথা বলা হয়েছে। সেটা হল, সামরিক অভিযান, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মোকাবিলা এবং সামজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তার জন্য ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সি পুরুষ এবং ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সি নারীদের যে কোনও সময় তলব করতে পারবে সরকার। 

সীমিত আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিয়ে যে কোনও বাড়ি, ভবন, যানবাহন বা সরঞ্জাম অধিগ্রহণের অধিকারও পেয়েছে জিনপিং প্রশাসন।

কমিউনিস্ট চীনের সরকার মনে করে, অক্টোবরে সংশোধিত আইনটি চালু হলে রাষ্ট্রের চাহিদা মতো যাবতীয় প্রস্তুতি নিয়ে ফেলবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে যাবতীয় বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান। 

ফলে প্রয়োজনের সময় তাদের থেকে সাহায্য পেতে সমস্যা হবে না বেইজিংয়ের। যদিও এই নিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে কোনও বিবৃতি দেয়নি শি প্রশাসন।

সাবেক সেনাকর্তাদের কেউ কেউ মনে করেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যেই তাইওয়ান আক্রমণের ছক কষছেন জিনপিং। সেই সামরিক অভিযানের নীল নকশা ইতিমধ্যেই তৈরি করে ফেলেছেন ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র জেনারেলরা। 

এতে জাপান জড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট সংঘাত যে ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়বে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। তাই আটঘাঁট বেঁধে লড়াইতে নামতে চাইছে বেইজিং।

প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ানকে কখনওই পৃথক দেশ হিসাবে মান্যতা দেয়নি চীন। উল্টো একে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে বেইজিং। 

অন্য দিকে, রিপাবলিক অফ চায়নার নিরাপত্তা সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে আমেরিকা। ফলে ইচ্ছা থাকলেও সেখানে সামরিক অভিযান পাঠানোর সাহস দেখাচ্ছে বেইজিং। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ করে ইরান যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি সম্পূর্ণ অন্য দিকে মোড় নিয়েছে বললে অত্যুক্তি হবে না।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের কথায়, ডিসেম্বরের মধ্যে তাইওয়ান দখলে চীনা লালফৌজ ঝাঁপিয়ে পড়লে সত্যিই কিছু করতে পারবে না আমেরিকা। কারণ, ইরান যুদ্ধে বিপুল পরিমাণে হাতিয়ার ও গোলা-বারুদ খরচ করে ফেলেছে ওয়াশিংটন। 

তা ছাড়া, সম্পূর্ণ নতুন একটি ফ্রন্টে লড়াইতে নামা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে বেশ কঠিন। অন্য দিকে, বেইজিংয়ের বিশাল বাহিনীকে আটকানোর ক্ষমতা নেই জাপানের। তাই বেসামরিক ক্ষেত্রকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বলে রণবাদ্য একরকম বাজিয়েই দিলেন জিনপিং।

-এমএমএস