আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২৪ পিএম
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান অচলাবস্থার মধ্যে উত্তেজনা কমানো এবং কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে তেহরানে পৌঁছেছেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তার এই সফরে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আঞ্চলিক পরিস্থিতি, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংলাপ এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী এমন এক সময়ে তেহরান সফর করছেন, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার পথ কার্যত স্থবির। প্রায় ছয় মাস ধরে চলা যুদ্ধের সামরিক তৎপরতা অনেকটাই কমে এলেও সংঘাতের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে তিনি ‘তাড়াহুড়ো করছেন না’।
আলোচনায় হরমুজ প্রণালি
শেখ মোহাম্মদের সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বৈঠকে প্রণালিতে অবাধ নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর আগের পরিস্থিতিতে ফিরে যাওয়া এবং উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালির ওপর চলমান সংঘাতের ব্যাপক প্রভাব পরিলক্ষিত হয়েছে। যুদ্ধের আগে এই জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবহন হতো। সর্বশেষ জাহাজ চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তেল পরিবহন কমে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।
এদিকে বৃহস্পতিবার প্রণালিতে একটি ট্যাংকারে অজ্ঞাত একটি বস্তু আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (UKMTO) জানিয়েছে, আগুন পরে নিয়ন্ত্রণে আসে এবং জাহাজটির সব ক্রু নিরাপদে রয়েছেন।
কাতারের মধ্যস্থতার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হলেও ইরানের প্রতিবেশী কাতার দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। চলতি বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতির কাঠামো তৈরিতেও দোহা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এখন সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আবারও সক্রিয় করার চেষ্টা করছে কাতার।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানিয়েছেন, কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরান সফরে কাতারের মধ্যস্থতা কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আঞ্চলিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
ওমানের সঙ্গে হরমুজ নিয়ে আলোচনা
কাতারের এই সফরের আগে ইরান ও ওমানও হরমুজ প্রণালি নিয়ে কয়েক দফা আলোচনা করেছে। ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) এক মুখপাত্র দাবি করেছিলেন, প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও এর মাধ্যমে পাওয়া রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে দুই দেশ সমঝোতায় পৌঁছেছে।
তবে পরে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি এবং এর বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা চলছে। ফলে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক করার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।
একের পর এক কূটনৈতিক তৎপরতা
কাতারের প্রধানমন্ত্রীর তেহরান সফরের আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির এবং ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদিও ইরান সফর করেছেন। পাকিস্তান জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো, হরমুজ প্রণালি পুনরায় সচল করা এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফলে সাম্প্রতিক সময়ে কাতার, ওমান ও পাকিস্তানের একের পর এক তেহরান সফরকে ইরান যুদ্ধ ঘিরে নতুন আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল বিরোধ— বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধ-পরবর্তী নিরাপত্তা কাঠামো— এখনো অমীমাংসিত।
কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরানে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেন, সেটিই এখন আঞ্চলিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তার সফর সফল হলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার পথই নয়, হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স, আল-জাজিরা
এফএ