আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫৮ পিএম
ঘড়ির কাঁটায় তখন ভরদুপুর বা বিকেল, অথচ চারপাশ আচমকাই ঢেকে যাবে ঘুটঘুটে অন্ধকারে। আগামীকাল বুধবার (১২ আগস্ট) এমনই এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী হতে যাচ্ছে বিশ্ববাসী। উত্তর আটলান্টিক ও ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আকাশজুড়ে দেখা যাবে রাজকীয় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ। প্রায় আড়াই মিনিটের জন্য সূর্যের আলো সম্পূর্ণ কেড়ে নেবে চাঁদ। দক্ষিণ এশিয়ার বাসিন্দারা সরাসরি এই রোমাঞ্চ মিস করলেও, আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে ঘরে বসেই লাইভস্ট্রিমে মেতে উঠতে পারবেন এই মহাজাগতিক উৎসবে।
এই জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখান দিয়ে অতিক্রম করে এবং সূর্যের কিছু বা সব আলো আমাদের কাছে পৌঁছানো থেকে বাধা দেয়।
তবে সূর্যগ্রহণের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। সাধারণত চার ধরনের সূর্যগ্রহণ হয়। এগুলো হলো- মোট, আংশিক, সংকর এবং বৃত্তাকার। এগুলোকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ, বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ, হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ এবং আশিংক সূর্যগ্রহণও বলা হয়।
মানুষ যে ধরনের গ্রহন দেখতে পায় তা নির্ভর করে চাঁদ কীভাবে পৃথিবী এবং সূর্যের সাথে সারিবদ্ধ হয় এবং চাঁদ পৃথিবী থেকে কত দূরে।

পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ ঘটে যখন সূর্য, চাঁদ ও পৃথিবী একই সরলরেখায় নিখুঁতভাবে অবস্থান করে এবং চাঁদ সূর্যের চাকতিকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে। এর ফলে আকাশ ভোর বা গোধূলির মতো অন্ধকার হয়ে যায়।
অন্যদিকে যখন চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলে না এবং সূর্যের বাহিরের অংশ বলয় অথবা আংটির মতো দেখা যায় এই অবস্থাকে বলয়গ্রাস গ্রহণ বলা হয়। এই গ্রহণ হওয়ার মূল কারণ হলো চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে থাকে এবং চাঁদকে তুলনামূলক ছোট দেখায়, তাই তা পুরো সূর্যকে ঢাকতে পারে না। সূর্যের পূর্ণগ্রাস গ্রহণের মতই বলয়গ্রাসের সময়ও একটা ছায়া ফেলা পথ তৈরি হয়। এই পথের মধ্যে পৃথিবীর যেসব অঞ্চল, সেখান থেকে বলয়গ্রাস গ্রহণ দেখা যায়।
যখন কোনো সূর্যগ্রহণ পূর্ণগ্রাস দিয়ে শুরু হয় এবং পৃথিবীর নিজ অবস্থান থেকে সরে যায় এই সময়কে মিশ্রগ্রহণ বা হাইব্রিড এক্লিপ্স বলা হয়। এটি খুবই বিরল ঘটনা বলে জানিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা আইএসি। সংস্থাটি বলছে, সব সূর্যগ্রহণের মাত্র ৪ শতাংশ হয় মিশ্র ধরনের।
এছাড়াও যে সময় চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না, সেই সময়ে সূর্যকে আমরা অর্ধচন্দ্রাকার আকারে দেখতে পাই। যায়। সূর্যের একটি অংশ অন্ধকার ছায়ায় ঢেকে যায়, তাকেই বলে আংশিক সূর্য গ্রহণ বলে।
এই সব ধরনের সূর্যগ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ থেকে ভিন্ন। চন্দ্রগ্রহণের সময় পৃথিবী সূর্য ও চাঁদের মাঝখানে অবস্থান করে এবং তার ছায়া চাঁদের ওপর পড়ে।
আসন্ন সূর্যগ্রহণ হবে বুধবার ১২ আগস্ট। উত্তর রাশিয়া, গ্রিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, স্পেন এবং পর্তুগালের কিছু অংশে এটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ হবে।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, সূর্য পুরোপুরি আচ্ছাদিত হওয়ার মুহূর্ত, অর্থাৎ টোটালিটি- এটা ঘটবে উত্তর রাশিয়ার একটি ছোট ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এবং দুপুরের দিকে। এরপর এটি পৃথিবীর ওপর দিয়ে পূর্ব দিকে অগ্রসর হবে এবং স্থানীয় সময় সন্ধ্যার শেষ ভাগে, সূর্যাস্তের ঠিক আগে, স্পেনে পৌঁছাবে। তবে এটি খুবই স্বল্পস্থায়ী হবে; পূর্ণগ্রাস অবস্থা স্থায়ী হবে আড়াই মিনিটেরও কম।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাংশ, কানাডা, উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকা এবং ইউরোপের কিছু অংশে আংশিক সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। কিছু স্থানে সূর্যের ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি অংশ আড়াল হয়ে যাবে। এছাড়াও আফ্রিকার কিছু অংশ এবং মূল ভূখণ্ড ইউরোপে এটি আরও বিশেষ হবে, কারণ সেখানে সূর্যাস্তের সময় আংশিক গ্রহণ চলতে থাকবে, যা সূর্যাস্ত গ্রহণ নামে পরিচিত।
তবে বাংলাদেশ সময় রাত ৯টা ৩৪ মিনিটে এই গ্রহণ শুরু হওয়াতে এই সময়ে এই অঞ্চলে সূর্য দিগন্তের নিচে থাকবে।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশ, ভারত এবং আশেপাশের অঞ্চল থেকে থেকে সূর্যগ্রহণ দেখা না গেলেও চাইলে নাসার ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা যাবে। ফলে সূর্যগ্রহণ দেখতে আগ্রহী ব্যক্তিরা সহজেই স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের মাধ্যমে অনলাইনে সরাসরি পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখতে পারবেন।
আগামীকালের সূর্যগ্রহণটি মূলত ইউরোপে দীর্ঘ ২৬ বছরের অপেক্ষার অবসান এবং অনন্য কিছু মহাজাগতিক সংযোগের কারণে অত্যন্ত বিরল।
জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ সূর্যগ্রহণের তুলনায় এই গ্রহণের বেশ কিছু বিশেষত্ব রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো- এই সূর্যগ্রহণের ঠিক একই রাতে (১২-১৩ আগস্ট) বিখ্যাত ‘পারসেইড উল্কাবৃষ্টি’ তার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছাবে। অমাবস্যার অন্ধকার আকাশের কারণে একই দিনে সূর্যগ্রহণ ও চমৎকার উল্কাবৃষ্টি দেখার এমন দ্বৈত সুযোগ ইতিহাসে খুবই কম আসে।

যেসব এলাকায় গ্রহণটি দৃশ্যমান হবে, সেখানকার দর্শনার্থীদের অবশ্যই সার্টিফাইড ‘ISO 12312-2’ সৌর-পর্যবেক্ষণ চশমা বা বিশেষ সোলার ফিল্টার ব্যবহার করতে হবে। সাধারণ সানগ্লাস বা খালি চোখে আংশিক সূর্যের দিকে তাকানো চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
এমএইচআর