আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৯ জুলাই ২০২৬, ০৬:১৪ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানা পাঁচ মাসের যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং অভ্যন্তরীণ নানা সংকট সত্ত্বেও ইরানের অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি। তবে এই স্থিতি ধরে রাখার সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় কমে যাওয়া, দারিদ্র্য বৃদ্ধি এবং নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে থাকায় কোটি কোটি ইরানির জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বহুমুখী অভ্যন্তরীণ উৎপাদনব্যবস্থা এবং বিকল্প বাণিজ্য নেটওয়ার্ক ইরানকে অর্থনৈতিক ধস থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু এই সক্ষমতা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ধরে রাখতে পারেনি। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দেশটির অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের দেশ ইরান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদনকারী রাষ্ট্র। কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নিষেধাজ্ঞার মুখে দেশটি শুধু তেলের ওপর নির্ভর না থেকে কৃষি, উৎপাদনশিল্প ও সেবাখাতও সম্প্রসারণ করেছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, সীমান্ত বাণিজ্য, অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজার, সমুদ্রপথে বিকল্প বাণিজ্য এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানির নানা উপায় ইরানের অর্থনীতিকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা, গত বছরের জুনের পর থেকে দুটি যুদ্ধ, দেশজুড়ে বিক্ষোভ, হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং কয়েক দফা ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে ইরানের সাধারণ মানুষের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে, আয় কমছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ডাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটির গবেষক এবং কুইন্সি ইনস্টিটিউটের ফেলো হাদি কাহালজাদেহ বলেন, কোনো অর্থনীতিকে তখনই ধসে পড়া বলা যায়, যখন সেখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং রাষ্ট্র কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ বা মৌলিক সেবা দেওয়ার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
তিনি বলেন, ‘ইরানের অর্থনীতি এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছেনি। যুদ্ধ, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা যত কঠিনই হোক, অদূর ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে আমি মনে করি না।’
বিশ্লেষকদের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার প্রভাবে ইরানে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে। এক বছরের ব্যবধানে মাংস, ডিম, ভোজ্যতেলসহ অনেক নিত্যপণ্যের দাম তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
একই সময়ে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রার মান ক্রমাগত কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর পণ্যের দামও বেড়েই চলেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব, যার কারণে নতুন পণ্যের সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে।
কাহালজাদেহর মতে, মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়া হচ্ছে। এতে বাজারে পণ্যের সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না, কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।
তাঁর ভাষায়, ‘এভাবে অর্থনীতিকে সচল রাখা সম্ভব হলেও এর সবচেয়ে বড় চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ পরিবারের ওপর। পরে সরকার ভর্তুকি ও নগদ সহায়তার মাধ্যমে সেই চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করে। এটি টিকে থাকার ব্যয়বহুল উপায়, তবে অর্থনীতিকে ধসে পড়া থেকে রক্ষা করছে।’
বর্তমানে ইরানে মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১০০ ডলারেরও কম। সরকার প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য নগদ সহায়তা ও ইলেকট্রনিক কুপন দিচ্ছে, তবে সেই সহায়তা জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
ইরানের সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানিয়েছেন, চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বোমা হামলায় ১২টি সেতু ও দুটি সুড়ঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদন অবকাঠামোরও কিছু অংশ ক্ষতির মুখে পড়েছে।
তাঁর দাবি, পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে। আগে শিল্পকারখানায় সপ্তাহে তিন দিন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা থাকলেও তা কমিয়ে দুই দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় পেনশন তহবিল-সংশ্লিষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাবা পেনশন স্ট্র্যাটেজিস ইনস্টিটিউট-এর ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাঁচ বছর আগে দেশটির ৩০ শতাংশের কিছু বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতেন। চলতি বছরে সেই হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে এবং তা এখনো বাড়ছে।
জার্মানির ফিলিপস ইউনিভার্সিটি মারবুর্গ-এর মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফরজানেগানের মতে, ইরানের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ সংকট হলো প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি।
তিনি বলেন, তেল থেকে আসা বিপুল আয় দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো আড়াল করেছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে, বেসরকারি খাত দুর্বল হয়েছে এবং উদ্ভাবন ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের গতি কমেছে।
ইরানের জেনারেল ইন্সপেকশন অর্গানাইজেশনের প্রধান জাবিহুল্লাহ খোদাইয়ান জানিয়েছেন, নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও তেল বিক্রির অর্থ দেশে ফেরানোর দায়িত্ব পাওয়া কয়েকজন ব্যক্তি রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।
তাঁর দাবি, এসব ব্যক্তির কাছে অন্তত ১১ বিলিয়ন ডলার আটকে আছে। এর মধ্যে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার অপব্যবহার করা হয়েছে।
তিনি জানান, অভিযুক্তদের কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। তাঁদের একজনের বিরুদ্ধে ২০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
খোদাইয়ান আরও জানান, আইনি বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও ২০ হাজারের বেশি রপ্তানিকারক এখনো প্রায় ৯৪ বিলিয়ন ইউরো রপ্তানি আয় দেশে ফেরত আনেননি।
হাদি কাহালজাদেহর মতে, দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা ইরানের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন এনেছে।
তাঁর ভাষায়, ‘২০১১ সালে ইরানের অধিকাংশ মানুষ মধ্যবিত্ত শ্রেণির ছিল। এখন সেই চিত্র পাল্টে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে রয়েছে অথবা দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বসবাস করছে।’
এর প্রভাব রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে দেশের শহর ও গ্রামজুড়ে দেখা যাচ্ছে। অনেক পরিবার খাদ্যতালিকা থেকে মাংস ও দুগ্ধজাত খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে। চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। বাড়িভাড়া পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। এমনকি মাসের শুরুতেই অনেকের বেতন ফুরিয়ে যাচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছে। সামরিক সংঘাত অনেকটাই কমলেও উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। লোহিত সাগর, কাস্পিয়ান সাগর এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।
অধ্যাপক মোহাম্মদ রেজা ফরজানেগানের মতে, নিষেধাজ্ঞা ও সংঘাতের ঝুঁকি বহাল থাকলে শুধু অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংস্কারের মাধ্যমে ইরানের টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, ‘চীন, রাশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু তা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিকল্প হতে পারে না।’
তার মতে, ইরানের জন্য সবচেয়ে জরুরি অর্থনৈতিক পদক্ষেপ হলো কূটনীতির মাধ্যমে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কমানো। স্থিতিশীল পরিবেশ ছাড়া অর্থনীতি টিকে থাকলেও প্রকৃত পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
সূত্র: আল জাজিরা
এমএইচআর