আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৩ মে ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
ভারতের নির্বাচন কমিশনের সাফল্যে ব্যর্থতার ‘দাগ’ লাগিয়ে দিল পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার ফলতা। শেষপর্যন্ত বিধানসভা নির্বাচনে গোটা আসনটির ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোটগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এমন পরিস্থিতি সাম্প্রতিক অতীতে অন্তত পশ্চিমবঙ্গে ঘটেছে বলে কেউ মনে করতে পারছেন না। আগামী ২১ মে ফলতার ২৮৫ ভোটকেন্দ্রে আবার ভোটগ্রহণ হবে। আর ভোটগণনা হবে আগামী ২৪ মে।
এর ফলে সোমবার (৪ মে) ফলতা বাদে রাজ্যের ২৯৩ আসনে ভোটগণনা হবে। শনিবার (২ মে) রাতে কমিশন বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ফলতা বিধানসভার ভোটগ্রহণের বিষয়টি জানিয়েছে কমিশন।
২৯ এপ্রিল (বুধবার) ফলতা বিধানসভা আসনের দ্বিতীয় দফায় যেসব কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হয়েছে, তা পুরোটাই বাতিল করা হয়েছে।
কমিশনের বিজ্ঞপ্তি অনুসারে, ফলতার বহু ভোটকেন্দ্রে গুরুতর নির্বাচনী অপরাধ এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ভঙ্গের অভিযোগ রয়েছে। সেই কারণে গোটা বিধানসভা আসনেরই গত বুধবারের ভোটগ্রহণ বাতিল করা হয়েছে।
দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে থেকেই সংবাদের শিরোনামে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা। ডায়মন্ড হারবার জেলার পুলিশ পর্যবেক্ষক অজয়পাল শর্মা বনাম ফলতার তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের মধ্যে ‘ঠান্ডা লড়াই’ শুরু হয়। ভোটের দিন ওই ফলতাতেই ইভিএম কারচুপির অভিযোগ ওঠে।
একই সঙ্গে পুনর্নির্বাচন চেয়ে আবেদনও যায় কমিশনের কাছে। কোন বুথে পুনর্নির্বাচন হবে, তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্ক্রুটিনি করে কমিশন। দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা থেকেই বেশি বুথে পুনর্নির্বাচনের আবেদন জমা পড়েছিল। সেই তালিকায় ছিল ফলতাও।
ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নির্দেশে ফলতা, মগরাহাট, ডায়মন্ড হারবার-সহ দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন এলাকায় স্ক্রুটিনি প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করতে যান কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত।
পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পুনর্নির্বাচন সংক্রান্ত রিপোর্ট দিল্লিতে পাঠান সুব্রত। সেই রিপোর্টে বিশেষ করে উল্লেখ ছিল ফলতার নাম। কমিশনের কাছে পাঠানো প্রস্তাবে সুব্রত জানান, ফলতার প্রায় ৩০টি বুথে পুনর্নির্বাচন করানো হোক। কেন তিনি পুনর্নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছেন, তার ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
ফলতায় পুনর্নির্বাচন সংক্রান্ত স্ক্রুটিনিতে চাঞ্চল্যকর তথ্য ধরা পড়েছে। ফলতার একাধিক বুথে নাকি ক্যামেরাই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল! নেটওয়ার্কের কারণে কন্ট্রোল রুমে সেই তথ্য আসেনি। তা ছাড়া বেশ কয়েকটি বুথে ইভিএমে টেপ লাগিয়ে বিভিন্ন দলের প্রতীক ঢেকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ভোটের দিন প্রিসাইডিং অফিসার দুপুর ১টায় জানান, টেপ তুলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ততক্ষণে ওই বুথগুলিতে প্রায় ৫৮ শতাংশ ভোট পড়ে গিয়েছিল বলে জানা গিয়েছে। ফলে ওই বুথগুলির ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তাই এই বুথগুলিতে পুনর্নির্বাচনের প্রস্তাব দেওয়া হয় কমিশনকে।
তার পরেই কমিশন নতুন করে আবার ফলতা বিধানসভায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল। ভোটের পরেও বার বার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ফলতা। শুক্রবার দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়ায় ফলতায়। বিজেপি কর্মীদের উপর মারধরের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল ফলতার হাশিমনগর।
শনিবারও ওই একই এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। হাশিমনগর এলাকার বাসিন্দাদের একাংশ তথা বিজেপি কর্মীদের অভিযোগ, তাদের ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। তার প্রতিবাদ করায় তৃণমূলের পঞ্চায়েত প্রধানের নেতৃত্বে কিছু লোকজন হামলা চালিয়েছেন।
বিজেপির কর্মী এবং সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে। শুক্র, শনিবার— দু’দিন জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধেরা। পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন তাঁরা। একই সঙ্গে তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খান এবং তার ‘ঘনিষ্ঠ’ কয়েক জন নেতার গ্রেফতারির দাবিও উঠেছে।
এ অবস্থায় হুমকি দেওয়া এবং ভয় দেখানোর অভিযোগে জাহাঙ্গিরের ‘ঘনিষ্ঠ’দের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিল কমিশন। ইসরাফুল এবং অপর এক জাহাঙ্গির-ঘনিষ্ঠ সুজাদ্দিন শেখের নামোল্লেখ করে তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধেও এফআইআর দায়ের করার নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। স্থানীয় পুলিশকে ফলতার আইনশৃঙ্খলার ওপর নজর রাখার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
ভোটগণনার জন্য অতিরিক্ত গণনা পর্যবেক্ষক (কাউন্টিং অবর্জার্ভার) নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। নিয়োগ করা হচ্ছে আরও পুলিশ পর্যবেক্ষকও।
সব মিলিয়ে মোট ২৪২ জন পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন। ওই পর্যবেক্ষকদের কাজ হবে গণনা প্রক্রিয়ায় সাহায্য করা। তা ছাড়া গণনাকেন্দ্রের নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা পর্যবেক্ষণের জন্য পুলিশ পর্যবেক্ষকদের নিয়োগ করা হচ্ছে।
-এমএমএস