আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নাকি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঘটতে চলেছে রাজনৈতিক ভরাডুবি-এই প্রশ্নেই এখন সরগরম পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি। টানা দেড় দশকের শাসন ধরে রাখার লড়াইয়ে তৃণমূল কংগ্রেস যেমন উন্নয়নের ধারাকে সামনে রেখে আত্মবিশ্বাসী, তেমনই দুর্নীতি, প্রশাসনিক অবক্ষয় ও পরিবর্তনের দাবিকে হাতিয়ার করে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে বিজেপি।
উন্নয়ন বনাম পরিবর্তন, পরিচয় বনাম অধিকার, সামাজিক প্রকল্প বনাম কাঠামোগত সমালোচনা-এমন বহু স্তরের রাজনৈতিক প্রশ্ন এখন ভোটের মাঠে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কিছু সামাজিক উদ্বেগও। বিশেষ করে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত জটিলতা এবং নাগরিকত্ব নিয়ে আশঙ্কা কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করেছে বলে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের মত। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার স্বচ্ছতার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে, তবুও মানুষের মনে পুরোপুরি আস্থা ফেরেনি।
শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের নির্বাচনী প্রচারে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে সামাজিক প্রকল্প ও জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির ওপর। লক্ষ্মীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, স্বাস্থ্যসাথী, যুবশ্রীসহ একাধিক প্রকল্পকে তারা রাজ্যের সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত উন্নয়ন হিসেবে তুলে ধরছে। তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্যে বারবার উঠে আসছে-এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হলে জনগণের সমর্থন আবারও তাদের দিকেই ফিরবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে সভা করে ‘উন্নয়নই একমাত্র পরিচয়’-এই বার্তাকে আরও জোরালো করার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে বিজেপি এই নির্বাচনে নিজেদের পূর্ণ শক্তি দেখিয়েছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক শীর্ষ মুখ রাজ্যে ঘন ঘন প্রচারে নেমেছিলেন। তাদের মূল ইস্যু হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে দুর্নীতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং অনুপ্রবেশের অভিযোগ। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী ভোটের প্রচারে দাবি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। বিজেপির প্রচারে উন্নয়নের বিকল্প কাঠামো এবং নতুন প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে, যাতে ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা আরও গভীর হয়।
এই দুই শক্তির মাঝখানে বামপন্থিরা নিজেদের রাজনৈতিক পুনর্জন্মের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একসময় রাজ্য শাসন করা বামফ্রন্ট এখন সংগঠন পুনর্গঠন, যুব সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ইস্যুতে সক্রিয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। যদিও আগের মতো প্রভাব ফেরানো কঠিন বলে মনে করছেন অনেকে, তবুও তারা বিকল্প রাজনীতির বার্তা দিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
এই রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেছেন, তাদের কাছে থাকা অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুযায়ী বিজেপি প্রত্যাশিত ফল পাবে না এবং তৃণমূল কংগ্রেস এবারও দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে। একই সঙ্গে তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন, অভিযোগ করেছেন যে কিছু এলাকায় ভোট প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তার দাবি, গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে বিজেপি শিবির থেকেও পালটা অভিযোগ আসছে। বিশেষ করে ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাজনৈতিকভাবে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবেন।
বিগত বিধানসভায় ‘অ্যাক্সিস মাই ইন্ডিয়া–ইন্ডিয়া টুডে’ জানিয়েছিল, তৃণমূলকে সামান্য ব্যবধানে হলেও বিজেপি পিছিয়ে দেবে। বিজেপি পাবে ১৩৪ থেকে ১৬০ আসন, তৃণমূল ১৩০ থেকে ১৫৬। চ্যানেলে আলোচনার সময় এদের অধিকাংশই ত্রিশঙ্কু বা ঝুলন্ত বিধানসভার সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেন।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলও এই লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। সেই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও বিজেপি উল্লেখযোগ্যভাবে তাদের আসন বাড়িয়ে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছিল। সেই ধারাবাহিকতা থেকেই এবারের লড়াই আরও তীব্র ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং তৃণমূল কংগ্রেস-এই তিন শক্তি বিভিন্ন সময়ে রাজ্য শাসন করেছে। বর্তমানে সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে বিজেপি নিজেদের জায়গা শক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে এখনো পর্যন্ত তারা রাজ্যে সরকার গঠন করতে পারেনি, যা তাদের সামনে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সব মিলিয়ে ২০২৬ সালের এই নির্বাচন শুধু ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং এটি উন্নয়ন, পরিচয়, আস্থা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভোটের ফলাফলই নির্ধারণ করবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র কোন পথে এগোবে-মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি সত্যিই ইতিহাস গড়বেন, নাকি রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে, সেই উত্তর দেবে সময়।
এমআই