images

আন্তর্জাতিক

হরমুজ দিয়ে চলাচলে ভারতকে যে শর্ত দিল ইরান! 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:২৪ এএম

৪৬ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে হরমুজ প্রণালী পর হয়ে গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দরে গিয়ে পৌঁছে ‘শিবালিক’ নামে ভারতীয় একটি জাহাজ। সেই জাহাজে ভারতীয় পরিবারগুলিতে ব্যবহৃত প্রায় ৩২.৪ লাখ ১৪.২ কেজি সিলিন্ডারের সমপরিমাণ এলপিজি ছিল।

শিবালিকের পর মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) ৪৭ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) নিয়ে ভারতে এসে পৌঁছেছে এলপিজি জাহাজ ‘নন্দা দেবী’। 

যুদ্ধবিধ্বস্ত হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে জাহাজটি গুজরাতের ভাদিনার বন্দরে এসে পৌঁছায়। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করা এটি দ্বিতীয় জাহাজ।

এর আগে ৪৬ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি প্রাকৃতিক গ্যাস নিয়ে গুজরাতের মুন্দ্রা বন্দরে এসে পৌঁছেছিল ‘শিবালিক’ নামে একটি জাহাজ। 

কর্মকর্তাদের ধারণা, শুধুমাত্র এই জাহাজটিই ভারতের এক দিনের আমদানি করা এলপিজির চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরায়েল এবং আমেরিকা। প্রত্যাঘাত করেছে ইরানও। ইরান জানিয়ে দেয়, হরমুজ দিয়ে তারা কোনও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করতে দেবে না। 

তার পর থেকে ওই প্রণালীর দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে রয়েছে শতাধিক জাহাজ। ভারতেরও প্রায় দু’ডজন জাহাজ ছিল। তার মধ্যে এবার দু’টি জাহাজ হরমুজ পেরিয়ে ভারতে পৌঁছেছে।

হরমুজ প্রণালীর পশ্চিমে অবস্থিত পারস্য উপসাগরে ২৪টি ভারতীয় জাহাজের মধ্যে, শিবালিক এবং নন্দা দেবী নামের দুটি এলপিজি বহনকারী ট্যাঙ্কার নিরাপদে ভারতে এসে পৌঁছেছে। 

নন্দা দেবী গুজরাতে নোঙর করার পর তার থেকে ২৪ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি তামিলনাড়ুতে পাঠানো হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

দু’টি জাহাজের আগমনে ভারতে এলপিজি সরবরাহ স্থিতিশীল হবে এবং ঘাটতির ব্যাপক আশঙ্কা কিছুটা দূর হবে বলেও আশা করা হচ্ছে। 

অন্য দিকে, পূর্ব এশিয়া থেকে একটি ভারতীয় জাহাজ হরমুজ পেরোতে প্রস্তুত হয়েছে। শনিবার ভারতের কেন্দ্রীয় জাহাজ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সচিব রাজেশকুমার সিংহ জানিয়েছেন, জগপ্রকাশ নামে ওই জাহাজ ওমান থেকে আফ্রিকার উদ্দেশে রওনা হয়েছে। তাতে রয়েছে গ্যাসোলিন।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় বাণিজ্যিক জাহাজ যাতে নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারে, সেই নিয়ে গত কয়েক দিন তেহরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়েছে নয়াদিল্লি। 

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তার পরেই হরমুজ পেরিয়ে ভারতের পৌঁছেছে এলপিজি ভর্তি দু’টি জাহাজ।

হরমুজ প্রণালীর দুই প্রান্তে এখনও ভারতের অন্তত দু’ডজন পণ্যবোঝাই জাহাজ আটকে রয়েছে। সেগুলি যাতে নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছায়, সে জন্য পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে একাধিক বার ফোনে কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। 

ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও। তার পরেই ভারতে ইরানের রাষ্ট্রদূত আশ্বাস দেন, হরমুজ দিয়ে নির্বিঘ্নে চলাচল করবে ভারতের বাণিজ্যিক জাহাজ।

তবে জানা গিয়েছে, ভারতীয় জাহাজগুলি যাতে হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদে যাতায়াত করতে পারে তার জন্য নয়াদিল্লির কাছে দু’টি শর্ত রেখেছে ইরান। তেমনটাই উঠে এসেছে রিপোর্টে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তিনটি সূত্রকে উদ্ধৃত করে সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী জানা গেছে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে ভারতীয় জাহাজের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার জন্য প্রথম শর্ত হিসাবে, নয়াদিল্লিকে তাদের তিনটি ট্যাঙ্কার ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওই ট্যাঙ্কার তিনটি ভারতীয় জলসীমার কাছে আটক করেছিল ভারত।

ভারতের অভিযোগ ছিল, ‘অ্যাসফল্ট স্টার’, ‘আল জাফজিয়া’ এবং ‘স্টেলার রুবি’ নামের ওই ট্যাঙ্কার তিনটি নিজেদের পরিচয় গোপন বা পরিবর্তন করেছিল এবং সমুদ্রে অবৈধ ভাবে জাহাজ থেকে জাহাজে পণ্য পাচারে জড়িত ছিল। 

এর মধ্যে ‘স্টেলার রুবি’ জাহাজটিতে ইরানের পতাকা এং অন্য দুটি জাহাজে নিকারাগুয়া এবং মালির পতাকা ছিল।

ভারতীয় উপকূলরক্ষা বাহিনীর দায়ের করা ১৫ ফেব্রুয়ারির একটি পুলিশি অভিযোগে বলা হয়েছে, ‘আল জাফজিয়া’ নামের ট্যাঙ্কারটিতে ভারী জ্বালানি তেল এবং ‘স্টেলার রুবি’ ট্যাঙ্কারে বিটুমিন পাচার করছিল ‘অ্যাসফল্ট স্টার’ নামের ট্যাঙ্কার। তিনটি জাহাজই বর্তমানে মুম্বই উপকূলে নোঙর করা আছে।

1773504862_hormuz-2

ট্যাঙ্কারগুলি বাজেয়াপ্ত করার সময় ‘ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি’র সূত্রকে উদ্ধৃত করে ইরানের একটি গণমাধ্যম জানায় যে, বাজেয়াপ্ত হওয়া তিনটি ট্যাঙ্কারের সঙ্গে তাদের সংস্থার কোনও সম্পর্ক নেই।

যুগবিন্দর সিংহ ব্রারকে ইরানের তেল পরিবহণে সহায়তাকারী একটি জাহাজবহর পরিচালনার দায়ে অভিযুক্ত করেছে আমেরিকা। 

যুগবিন্দর জানিয়েছেন, ভারতের বাজেয়াপ্ত করা তিনটি জাহাজেরই দায়িত্বে ছিলেন তিনি এবং জাহাজগুলি কোনও অবৈধ কাজ করেনি।

রয়টার্সকে যুগবিন্দর বলেন, আমরা বিটুমিন পরিবহণ করছিলাম এবং এটি কোনও অবৈধ কাজ নয়। আমার জাহাজগুলি ৪০ দিন ধরে আটকে রয়েছে এবং আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। ট্যাঙ্কারগুলি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে নয়াদিল্লির মধ্যে কোনও আলোচনার বিষয়ে তিনি অবগত নন বলেও জানিয়েছেন যুগবিন্দর।

দ্বিতীয় শর্ত হিসাবে তেহরান নির্দিষ্ট কিছু ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামও চেয়ে পাঠিয়েছে নয়াদিল্লির কাছে। সোমবার (১৬ মার্চ) নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে ভারতীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করেন।

পুরো বিষয়টি নিয়ে রয়টার্সের তরফে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ইরানি দূতাবাস এবং ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোনও উত্তর মেলেনি।

ভারতীয় জাহাজ চলাচলের পথ নিশ্চিত করার জন্য আলোচনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সোমবার বলেন যে, সাম্প্রতিক গতিবিধি দু’দেশের পরস্পরের সঙ্গে যোগযোগ এবং লেনদেনের ইতিহাসের প্রতিফলন। ইরানের সঙ্গে কোনও কিছু বিনিময় হচ্ছে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

ভারত সোমবার জানিয়েছে, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে কমপক্ষে ২২টি ভারতীয় পতাকাবাহী জাহাজ এবং ৬১১ জন ভারতীয় নাবিক রয়েছেন।

একটি ভারতীয় সূত্র জানিয়েছে, জাহাজগুলির মধ্যে ছয়টিতে এলপিজি আছে এবং রান্নার জ্বালানির ঘাটতি মেটাতে ভারত প্রথমে সেগুলি আনানোর বিষয়ে আগ্রহী। উল্লেখ্য, ভারতের মোট এলপিজি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে। 

-এমএমএস