বিশেষ প্রতিনিধি
১৬ মার্চ ২০২৬, ১১:৫৭ এএম
শিগগির প্রতিবেশী দেশ ভারত সফর করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ড. খলিলুর রহমান।
এর মধ্য গলতে শুরু করেছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের বরফ। গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে যে বৈরী সম্পর্ক ছিল, তা পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই সফরের পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের ভিসা ইস্যু ধাপে ধাপে স্বাভাবিক হতে পারে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে দুই দেশই সম্পর্ক উন্নতির পক্ষে যার যার অবস্থান ব্যক্ত করেছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়ন এবং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান খুব শিগ্গিরই ভারত সফরে যেতে পারেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
এ সফরে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জটিল ইস্যুগুলোয় নতুন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। দুই দেশের সামনে বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা, নিরাপত্তা, ইন্দো-প্যাসিফিক, সীমান্ত হত্যা, পুশইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সব বিষয় আছে।
আরও পড়ুন:
মন্ত্রণালয়ের সূত্রমতে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের নানা দিক নিয়ে কাজ চলছে। মাসখানেকের মধ্যে এ সফর হতে পারে।
তবে এ ব্যাপারে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়নি। মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই হবে তার প্রথম ভারত সফর।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উন্নয়নে বেশকিছু ইতিবাচক ঘটনা ঘটেছে। প্রায় দুই মাস বন্ধ থাকার পর দিল্লি ও আগরতলায় বাংলাদেশের মিশন থেকে ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া আবার শুরু হয়েছে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের প্রধান মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কায়সার রশিদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সেখানে তিনি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা-ত্রিপুরা পরিবহণও সীমিত আকারে আবার চালু হয়েছে। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও সহযোগী আলমগীরকে গ্রেফতার করেছে ভারতের পুলিশ। তাকে দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, পাইপলাইনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জ্বালানি তেল চেয়ে নয়াদিল্লিকে চিঠি দিয়েছে ঢাকা। গত বুধবার ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার সঙ্গে বৈঠকের পর এ কথা জানান তিনি। বাংলাদেশের ডিজেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহের অনুরোধ বিবেচনা করছে ভারত।
এ বিষয়ে সাবেক রাষ্ট্রদূত হুমায়ুন কবির বলেন, পারস্পরিক চাহিদা ও সরবরাহের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। আমাদের দিক থেকে আমরা সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছি। ভারতের চাওয়াও একই। পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা চাই ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ভিত্তি হবে আত্মমর্যাদা ও সমতার। এটাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা। এরপর বিভিন্ন রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষ যে কথাগুলো বলছে, সেগুলো নিয়ে সমাধান দরকার।
এর মধ্যে বাংলাদেশে ভারতের নাগরিকদের পুশইন, বর্ডার কিলিং এবং গঙ্গাচুক্তি নবায়নের বিষয় আছে। বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় বিষয়, দুই দেশের বিশ্বাসের জায়গায় যে চিড় ধরেছে, সেটি আবার স্বাভাবিক জায়গায় আনার জন্য কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ প্রয়োজন। তাহলেই সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে পারে।
প্রসঙ্গত, সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর থেকে ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ভারত নবনির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ করবে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় এসেছিলেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর।
তিনি বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির শোকবার্তা তুলে দেন। ঢাকা থেকে ফেরার দুই দিন পর বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে ভারতের সম্পক নিয়ে চেন্নাইয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আমরা আশা করি, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি থিতু হলে এই অঞ্চলে সুপ্রতিবেশীসুলভ চেতনা বৃদ্ধি পাবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। চিঠিতে তিনি বহুমুখী দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও জোরদার, আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি সংস্কৃতি ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বিনিময়সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের অভিন্ন লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জানান।
তিনি বলেন, দ্রুতবর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসাবে ভারত ও বাংলাদেশ একে-অপরের টেকসই প্রবৃদ্ধি, নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির প্রকৃত অনুঘটক হতে পারে।
অন্যদিকে তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিুলুর রহমান নিযুক্ত হওয়ায় ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক জোরদারের বিষয়টি আবার সামনে আসে।
খলিলুর রহমান গত বছরের নভেম্বরে ভারতের দিল্লিতে কলম্বো নিরাপত্তা কনক্লেভের ৭ম অধিবেশনে অংশ নেন। এর আগে তিনি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালকে ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ জানান।
নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর দুই দেশের মধ্যেই নমনীয় ভাব স্পষ্ট। দায়িত্ব গ্রহণের পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেছেন, জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না সরকার।
তিনি বলেন, ভারতকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। তবে পারস্পরিক আস্থা ও স্বার্থ নিশ্চিত করেই এগোবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের উদ্দেশে শনিবার (১৪ মার্চ) সকালে ঢাকা ছেড়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। নিউইয়র্ক যাওয়ার পথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তুরস্কে সংক্ষিপ্ত যাত্রা বিরতি করেন।
-এমএমএস