আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫৯ পিএম
পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) তদন্তের কাজে বাধা দেওয়া অভিযোগে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
গত ৮ জানুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস দলের নির্বাচনী পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান— আইপ্যাক-এর মালিকের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি চালানোর সময়েই সেখানে উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়ে হাজির হয়েছিলেন মমতা। দুই জায়গা থেকেই তিনি বেশ কিছু ফাইল ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ করেছে ইডি।
মমতা নিজেও গণমাধ্যমের সামনেই স্বীকার করেছিলেন যে দলের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নথি তিনি সরিয়ে এনেছেন।
যদিও মমতার বিরুদ্ধে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ নেই, তবে একজন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এভাবে তদন্তে বাধা দানের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়েই দেখছে সুপ্রিম কোর্ট।
অপরদিকে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট বা ইডি মূলত অর্থ পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত করে থাকে এবং প্রয়োজনে গ্রেফতার করারও ক্ষমতা তাদের রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করেছে সংস্থাটি। এতে প্রশ্ন উঠেছে এবার ইডির হাতে কি গ্রেফতার হতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়?
গত বৃহস্পতিবার তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনৈতিক পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের মালিক প্রতীক জৈনের বাড়ি ও দফতরে তল্লাশি শুরু করে ইডি। কেন্দ্রীয় এজেন্সি জানিয়েছিল যে কয়েক বছরের পুরোনো কয়লা এবং অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্তে আইপ্যাকের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে তারা। সেজন্যই তল্লাশি চলছিল। তখন হঠাৎ প্রতীক জৈনের বাড়িতে পৌঁছান মমতা।
বেশ কিছুক্ষণ পরে তিনি সঙ্গে একটি সবুজ ফাইল নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি নিজেই দাবি করেছিলেন যে তার দলের নির্বাচনী কৌশল সংক্রান্ত কিছু নথি এবং হার্ডডিস্ক নিয়ে এসেছেন তিনি। এরপরে সংস্থাটির দফতরে তল্লাশি চলাকালীন প্রায় চার ঘণ্টা ভেতরে ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেখান থেকেও অনেক ফাইল নিয়ে এসে তার গাড়িতে তোলা হয়েছিল গণমাধ্যমের সামনেই।
পরদিন এক জনসভায় মমতা ব্যানার্জী দাবি করেন, তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন হিসাবে তিনি যা করেছেন, ঠিক কাজ করেছেন।
অন্যদিকে ভারতের আইন আদালত সংক্রান্ত খবরের নির্ভরযোগ্য ওয়েবসাইট ‘বার অ্যান্ড বেঞ্চ’ জানিয়েছে যে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট দেশটির সুপ্রিমকোর্টের কাছে আবেদন করেছে, যাতে তদন্তে বাধা দেওয়ার কারণে মমতা ব্যানার্জীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআইকে তদন্ত করার নির্দেশ দেয় আদালত। তারা কলকাতা হাইকোর্টের কাছেও একই আবেদন জানিয়েছিল।
পাশাপাশি তারা হাইকোর্টের কাছে আবেদন করেছিল যাতে ওই পরামর্শদাতা সংস্থা ‘আই-প্যাক’-এর মালিক প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং দফতর থেকে যেসব নথি ও বৈদ্যুতিন প্রমাণ মমতা ব্যানার্জী নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলোও যেন তিনি ফেরত দেন।
এরআগে ভারতের যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সি
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রীর পদে থাকা অবস্থাতেই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) হাতে গ্রেফতার হন আম আদমি পার্টির (এএপি) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তিনি প্রথম মুখ্যমন্ত্রী, পদে থাকাকালীন অবস্থাতেই যাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠানো হয়েছিল।

দিল্লিতে মদের দোকানের লাইসেন্স দেওয়ার নীতি বদল করে কেজরিওয়াল এবং কয়েকজন মন্ত্রী ও নেতা মদ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন, এই অভিযোগেরই তদন্ত করছিল কেন্দ্রীয় এজেন্সিটি। গ্রেফতার করে তাকে তিহাড় জেলে রাখা হয়েছিল এবং সেখান থেকেই তিনি অনেকদিন সরকার চালিয়েছেন। পরে অবশ্য তাকে মুখ্যমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল।
বিভিন্ন সময়ে যে মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতার করা হয়েছে ভারতে, তার মধ্যে সব থেকে বেশি আলোচিত যে নামটি, সেটি বিহারের লালু প্রসাদ ইয়াদভের ঘটনা। তাকে গ্রেফতার করা হলেও ইয়াদভ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তার ঠিক আগে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে রাজ্যের দায়িত্ব তুলে দিয়েছিলেন স্ত্রী রাবড়ি দেবীর হাতে লালু। এরপরেই পুলিশের গাড়িতে ওঠেন তিনি।
গবাদিপশুর খাদ্য কেনার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ সরিয়ে নেওয়ার মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। মামলাটির নাম 'চারা ঘোটালা' –যার মানে 'পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি'।
মামলাটির তদন্ত করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই। তদন্তকারীদের নেতৃত্বে ছিলেন সিবিআইয়ের এক বাঙালি অফিসার উপেন বিশ্বাস।
পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির শুরু ১৯৯০-এর দশকে। সেসময়ে বিহার ভাগ করে ঝাড়খণ্ড রাজ্য তৈরি হয়নি। অবিভক্ত বিহারের বিভিন্ন ট্রেজারি থেকে পশু খাদ্য কেনার ভুয়া বিল দিয়ে সরকারি অর্থ তছরুপ করা হয়েছিল। একাধিক শহরে লালু প্রসাদ ইয়াদভ এবং কয়েকজন আমলার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল সিবিআই।

ওই দুর্নীতি সামনে আসার পরে প্রথমবার ইয়াদভ গ্রেফতার হন ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে। ভারতের সংবাদ মাধ্যমের প্রতিবেদনগুলো ঘেঁটে জানা যাচ্ছে যে তিনি ওই পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির বিভিন্ন মামলায় অন্তত ছয়বার জেলে গেছেন, আবার জামিনও পেয়েছেন তিনি।
শেষমেষ ওই দুর্নীতির মামলায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দিয়েছে একাধিক আদালত। ঘটনাচক্রে একই মামলায় গ্রেফতার হয়েছিলেন বিহারের আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রও। তিনি ছিলেন কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রী।
লালু প্রসাদ ইয়াদভ যখন কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন, সেই সময়ে রেলে চাকরি-দুর্নীতির আরেকটি মামলা এখন চলছে তার বিরুদ্ধে। সেই মামলায় এ বছরের নয়ই জানুয়ারি দিল্লির একটি আদালত মি. ইয়াদভ ও তার পরিবারের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেছে।
তবে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে, ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলে জয়প্রকাশ নারায়ণের ঘনিষ্ঠ ছাত্রনেতা হিসাবে লালু প্রসাদ ইয়াদভের প্রথম জেল যাত্রা। সেটা অবশ্য ছিল রাজনৈতিক গ্রেফতার। সেই পর্যায়ে দুবছর জেলে ছিলেন তিনি।
ঝাড়খণ্ড রাজ্যে জমি বিক্রি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি মামলায় ২০২৪ সালে ইডি গ্রেফতার করেছিল হেমন্ত সরেনকে। তিনি অবশ্য গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে পদত্যাগ করেন এবং সিনিয়র মন্ত্রী চম্পাই সরেন তার স্থলাভিষিক্ত হন। জেল থেকে জামিনে ছাড়া পেয়ে সরেন আবারও মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন এখন।
আগেও এই রাজ্যের দুজন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন। এদের মধ্যে প্রথম ছিলেন হেমন্ত সরেনের বাবা শিবু সরেন এবং দ্বিতীয়জন হলেন আরেক প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মধু কোড়া।
ঝাড়খণ্ডের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শিবু সরেনকে সিবিআই গ্রেফতার করেছিল একটি খুনের মামলায়। শিবু সরেনেরই ব্যক্তিগত সচিব শশীনাথ ঝাকে ১৯৯৪ সালে অপহরণ করে খুন করার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হওয়ার সময়ে – ২০০৬ সালে, তিনি ছিলেন মনমোহন সিং সরকারের কয়লা মন্ত্রী। গ্রেফতার হওয়ার আগে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন।
অপহরণ আর খুনের অভিযোগে তার যাবজ্জীবন কারাবাসের সাজা হয়েছিল। তবে পরে দিল্লি হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট – উভয়ই অপহরণ ও খুনের অভিযোগ থেকে মুক্তি দেয়।
হেমন্ত সরেনের আগে ঝাড়খণ্ডের যে আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী গ্রেফতার হয়েছিলেন, তার নাম মধু কোড়া। অর্থ পাচার ও আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পত্তির অভিযোগে ইডি তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠিয়েছিল।
ঘুষ নিয়ে কয়লাখনির বরাত পাইয়ে দিতেন – এই অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত হয় এবং ২০০৯ সালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় চার বছর বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জেলে ছিলেন ঝাড়খণ্ডের সব থেকে কম বয়সের মুখ্যমন্ত্রী মি. কোড়া।
পরে, ২০১৭ সালে তাকে দোষী বলে ঘোষণা করে আদালত এবং তিন বছরে জেল হয়।
দক্ষিণ ভারতের একাধিক রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও পদ থেকে সরে যাওয়ার পরে গ্রেফতার হয়েছেন দুর্নীতির অভিযোগে। এদের মধ্যে সব থেকে হাইপ্রোফাইল ঘটনা ছিল তামিলনাডুর প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জে জয়ললিতার গ্রেফতার।
২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ু রাজ্যের এক বিশেষ আদালত দুর্নীতির দায়ে চার বছরের কারাদণ্ড দেয়। সাজা ঘোষণার পরপরই তাকে কারাগারে নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীত্ব আর সংসদ সদস্যপদ হারান জয়ললিতা।
অন্যদিকে তামিলনাডুর প্রতিবেশী রাজ্য অন্ধ্র প্রদেশের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুকেও গ্রেফতার করা হয়েছিল ২০২৩ সালে। তখন তিনি অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না।
একাধিকবার অবিভক্ত অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী থাকা নাইডুকে ৩১৭ কোটি ভারতীয় টাকা মূল্যের একটি দুর্নীতির মামলায় গ্রেফতার করা হয়। তাকে অবশ্য কোনো কেন্দ্রীয় এজেন্সি নয়, ওই রাজ্যের সিআইডি গ্রেফতার করেছিল।
উত্তরাঞ্চলীয় হরিয়ানার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ওম প্রকাশ চৌতালা এই শতাব্দীর গোড়ার দিকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার এবং তার ছেলেকে ২০১৩ সালে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টও তাদের সাজা বহাল রেখেছিল।
২০২২ সালে তিনি আবারও আয়ের সঙ্গে সংগতিবিহীন সম্পদ রাখার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হন। চার বছরের জেলের সাজা হয়েছিল তার।
পদে থাকা অবস্থায় বা ইস্তফা দেওয়ার অব্যবহিত পরে কিংবা সাবেক মুখ্যমন্ত্রীদের গ্রেফতারির বাইরেও পশ্চিমবঙ্গ, দিল্লি, মহারাষ্ট্রসহ অনেক রাজ্যের মন্ত্রীদেরও গ্রেফতার করেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলো।
তবে তথ্য বলছে, এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট হোক বা কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো – সিবিআই – দুটি সংস্থার ক্ষেত্রেই আদালতে অপরাধ সাব্যস্ত করার হার খুবই কম। সবসময়েই অভিযোগ ওঠে যে কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল তাদের বিরোধীদের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় এজেন্সিগুলোকে কাজে লাগায়।বিবিসি বাংলা
এমএইচআর