ঢাকা মেইল ডেস্ক
১৮ নভেম্বর ২০২৪, ০৮:২৪ পিএম
ইসরায়েল ভৌগোলিকভাবে একটি ছোট দেশ। একদিকে শক্তিশালী সামরিক সুবিধা ও অপরদিকে সীমিত কৌশলগত গভীরতার কারণে এটি একটি দ্বি-ধারী তলোয়ারের মতো। ইসরায়েলের সামরিক ঘাঁটি ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষামূলকব্যবস্থা যেকোনো মুহূর্তে প্রতিক্রিয়া জানাতে প্রস্তুত থাকে। তবে এর দুর্বলতা হলো, সাইরেন বাজলেই ইসরায়েলি নাগরিকদের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে মাত্র ১২ থেকে ১৫ সেকেন্ড সময় থাকে। কারণ শহর ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা খুবই বেশি।
ইসরায়েলের অধিকাংশ জনসংখ্যা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উপকূলের একটি সংকীর্ণ এলাকাজুড়ে। এই উপকূলীয় সংকীর্ণ এলাকাই সাম্প্রতিক যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এ কারণে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে এবং দেশটির অর্থনীতি ও সুযোগ-সুবিধার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি থেকে নিজেদের রক্ষা করতে ইসরায়েল আয়রন ডোম, ডেভিডস স্লিং ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধ কৌশলগুলোর মতো প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করেছে। তবে তেল আবিব, হাইফা, আশকেলনসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এখনো ক্রমাগত বোমাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্মুখীন।
মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়া এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ করেছে। এই পরিস্থিতি ইসরায়েলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের জন্ম দিয়েছে। বিশেষত ড্রোন ও উচ্চ-গতির ক্ষেপণাস্ত্রের দ্রুত বিকাশ দেশটির নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে ফেলে দিয়েছে। কারণ এগুলো আয়রন ডোম ও অন্যান্য প্রতিরক্ষামূলকব্যবস্থাকে বাইপাস করতে সক্ষম।
ইসরায়েল সামরিকভাবে ‘গুণগত শ্রেষ্ঠত্বের’ ওপর নির্ভর করে। যার অর্থ এটি তার প্রতিপক্ষের তুলনায় অত্যাধুনিক অস্ত্র ও প্রযুক্তির অধিকারী। এই শ্রেষ্ঠত্বই ইসরায়েলকে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে সহায়ক হয়েছে। তবে ইসরায়েল একটি কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে দীর্ঘ সময়ের শান্তি অর্জন ও হুমকির স্থগিতকরণে বিশ্বাসী। সামরিক ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এই শান্তি কার্যকর করা যেত। তবে, ৭ অক্টোবর, ২০২৩-এ ঘটে যাওয়া হামলার ঘটনা এই কৌশলটির দুর্বলতা প্রকাশ করেছে ও ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, আয়রন ডোম কি এখনো ইসরায়েলকে রক্ষা করতে সক্ষম? আগামী দিনে নতুন ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন হবে?
ইসরায়েল বর্তমানে হামাসের সামরিক শক্তি সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করতে এবং গাজাকে এমনভাবে ধ্বংস করতে চায় যাতে হামাসের পুনর্গঠন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর লক্ষ্য হলো হামাসের আগের শক্তি পুনরুদ্ধার হতে কয়েক দশক সময় নেওয়া, যা গাজার যুদ্ধকে দীর্ঘ সময় ধরে শান্তিপূর্ণ করে রাখবে।
তবে, ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকরা জানান, হামাস কেবল একটি সামরিক সংগঠন নয়, এটি একটি ধারণা ও আদর্শ। ধারণা ও আদর্শ কখনো মরে না। পশ্চিম তীরে হামাসের প্রতি সমর্থন বৃদ্ধি পেলে, ইসরায়েল তার সীমানার ভেতরে এবং বাইরে একটি বড় জনসংখ্যাগত হুমকি অনুভব করছে।
ইসরায়েলের শান্তি তখনই আসবে, যখন তাদের শত্রুরা এই উপলব্ধি করবে যে, তাদের প্রতিরোধ নিরর্থক এবং তাদের সহিংসতার ফলস্বরূপ আরও দুর্ভোগ বৃদ্ধি পাবে। ইসরায়েলের দৃষ্টিতে, তাদের শত্রুদের বিশ্বাস করতে হবে যে, সহিংসতার চেয়ে সংলাপের মাধ্যমে কিছু লাভ হবে। তবে তাদেরকে ইসরায়েলের শর্তগুলো মেনে নিতে হবে।
ইসরায়েলের অস্তিত্ব ‘অস্বাভাবিক’ ও এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জ। ইসরায়েল তার অস্তিত্ব রক্ষায় প্রতিনিয়ত ‘ইহুদি রাষ্ট্র’ এর ধারণাকে শক্তিশালী করতে চেষ্টা করছে। তবে বর্তমানে ইসরায়েল ঐতিহ্যগত সেনাবাহিনীর চেয়ে অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মুখোমুখি। এই গোষ্ঠীগুলোর ধারাবাহিক হামলা ইসরায়েলকে ক্রমাগত চাপে রাখছে। দেশটির সামরিক এবং সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করছে।
এই পরিস্থিতি ইসরায়েলকে স্থায়ীভাবে ক্লান্ত করে তুলছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো: অতিরিক্ত সহিংসতা ইসরায়েলি নাগরিকদের জন্য কি সত্যিকারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছে? বাস্তবতা হলো, ইসরায়েলের ভূগোল এখন হুমকির মুখে। বিশেষ করে যারা দ্বৈত নাগরিকত্বে অধিকারী, তারা দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে ইসরায়েল আর বিনিয়োগের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নয়। হাইফা, তেল আবিব ও উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিত বড় প্রকল্পগুলো এখন স্থগিত হয়ে গেছে যা ইসরায়েলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সংকেত।
ইসরায়েল ভূরাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং লোহিত সাগরের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী একক শক্তিকে সীমিত করে রাখে। এই অঞ্চলটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথ, জ্বালানি এবং বিভিন্ন কাঁচামালের উৎস হিসেবে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল এক ধরনের ‘বীমা নীতি’ হিসেবে কাজ করে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর অর্থনৈতিক আধিপত্য নিশ্চিত করে।
তবে, এই ভূরাজনৈতিক ভূমিকা আরব অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অঞ্চলটি প্রায়শই চাপের মধ্যে থাকে, যেখানে দেশগুলো বিপুল পরিমাণ অর্থ পশ্চিমা অস্ত্র কেনার জন্য ব্যয় করতে বাধ্য হয় এবং যুদ্ধের চক্রে আটকে যায়। ফলে, আরব দেশগুলো তাদের উন্নয়নশীল সম্ভাবনা হারায় এবং এই অস্থিতিশীলতার কারণে পশ্চিমা বিশ্ব তাদের আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
এই বিবেচনায়, ইসরায়েলের অবস্থান শুধু একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে কাজ করছে।

ইরান তার নিরাপত্তার ধারণাকে পূর্ব ভূমধ্যসাগরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত মনে করে। এটি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অতীতে পারসিক সাম্রাজ্য বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে পূর্ব ভূমধ্যসাগর দখলে আগ্রহী হয়েছিল। আজকের পরিস্থিতিতে, এই অঞ্চলে তুরস্কের একচেটিয়া আধিপত্য একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী শক্তির আবির্ভাব ঘটাতে পারে, যা দক্ষিণ ভূমধ্যসাগরের দেশগুলোর জন্যও প্রযোজ্য।
এই ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের ভূমিকা অত্যন্ত কৌশলগত। এর লক্ষ্য হল পূর্ব ভূমধ্যসাগর বা এর আশেপাশে যেকোনো ধরনের রাজনৈতিক, সামরিক বা অর্থনৈতিক শক্তির বিকাশকে সীমিত করা। ইসরায়েলের এই ভূমিকাটি শুধু তার আঞ্চলিক স্বার্থ রক্ষার জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক শক্তি ভারসাম্য বজায় রাখতে পশ্চিমা বিশ্বকে সহায়তা করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
এতে বোঝা যায়, ইসরায়েলের কৌশল মূলত এ অঞ্চলে যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ শক্তির উদ্ভবকে প্রতিহত করা, যা বৈশ্বিক রাজনীতির একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।
তবে, সিরিয়ায় রাশিয়ার উপস্থিতি এবং চীনের সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবের বিস্তার পশ্চিমাদের কৌশলগত দ্বিধা সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি সঙ্কটময় হয়ে উঠেছে, এবং ভূ-রাজনৈতিক সমাধান জন্য কার্যকর কোনও পথ অবশিষ্ট নেই বলে মনে হচ্ছে।
ইসরায়েলের সম্প্রসারণ আগের মতো সম্ভব নয়, বিশেষ করে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে ইউরোপের পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে আমেরিকান সমর্থন দীর্ঘমেয়াদী হতে পারে না।
এটি ইঙ্গিত দেয় যে, যদিও ইসরায়েল সামরিক বিজয় অর্জন করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত দিক থেকে এটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যা পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গির জন্য একটি সতর্ক সংকেত।
লেখক: কলামিস্ট ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক